Header Ads

ad

ওপার রজনীগন্ধার ক্ষীণ আশ্বাস

 

ওপার রজনীগন্ধার ক্ষীণ আশ্বাস

একটি অসমাপ্ত সংলাপ

- উপাসিকা চ্যাটার্জ্জী

পর্ব_১


রাত্রি বোধহয় ২ টোর কাটা ছুঁলো। কুর্চি বালিশে মাথা রেখে অপেক্ষা করছে, চোখদুটো খোলা, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে অন্ধকারেও ফ্যানের ঘূর্ণায়মান ব্লেড গুলো লক্ষ্য করছে।

এই ভাবেই রোজ অপেক্ষা করে কুর্চি, আজ তিন মাস হল।

আপনারা যদি জিজ্ঞাসা করেন কার জন্য এই অপেক্ষা,ও কিন্তু বলতে পারবে না। আসলে আমার আপনার জগতে তার অস্তিত্ব নেই যে। কিন্তু কুর্চির জগতে সে জীবন্ত। সে রোজ আসে কুর্চির কাছে, অন্তত ওর তাই বিশ্বাস। কুর্চি তার নাম জানায় নি। তার নাম আমি দিলাম স্বপ্নেশ।

এবার বোধ হয় ওর অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো।

ওর ঘর টা ভরে গেল একটা দামি পারফিউমের গন্ধে।

এবার শুরু হলো কথপোকথন।


কুর্চি- এলে?

স্বপ্নেশ- হুম। আজকেও ঘুমাও নি? একদিনও এসে তোমার ঘুমন্ত মুখটা দেখতে পেলাম না।

- কেন তোমার আফসোস হয়!

- না। তবে...

- তবে কি?

- কিছু না।

- সত্যিই কিছু না? জানো আমি দেখেছি তোমার ঘুমন্ত মুখটা। একেবারেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলে যেদিন।

-হুম।

-কি হুম? আর কিছু বলবে না?

-কে বলেছিল অন্তিম শয্যা দেখতে?

-জানিনা। কিন্তু লোভ হল কেমন।

-কীসের লোভ? দুঃখ পাবার?

-বড়ো নিষ্ঠুর তুমি।

-হাসালে। বিনা কারণে কষ্ট পাচ্ছ‌ আর সব দায় যেন আমার।

-সত্যিই দায় নেই? তুমি চাও না আমি কষ্ট পাই?

-না চাই না।

-তবে আসো কেন?

-তাহলে আসতে বারন করে দিচ্ছ?

-সেটা পারলে তো ভালো হতো। কিন্তু সে জোর কোথায়? 

-বেশ তবে আসব না।

-থাকতে পারবে না এসে?


কোনো উত্তর নেই। উভয় পক্ষ‌ই কিছুক্ষণ নীরব। ঘরের আবহাওয়া কেমন‌ ভারী। কোনো বাতাস নেই।


আবার শুরু হলো কথা। স্বপ্নেশ ই নীরবতা ভাঙল প্রথম।


স্বপ্নেশ- আচ্ছা শৌর্য কে দূরে সরিয়ে দিলে কেন?

কুর্চি- জানিনা।

- সত্যি বলো। তুমি তো ওকে ভালোবাসতে।

- হ্যাঁ। বাসতাম তো। শুধু আমি নই ও আমাকেও ভালোবাসত।

- তবে?

- মিলত না যে। আমি উত্তরে গেলে ও দক্ষিণ।

- এমন তো কত সম্পর্ক হয়। তা বলে কি কেউ সুখী হয় না?

- আমি তো সুখ চাই নি।

- তবে দুঃখ চাও?

- জানিনা। 

- শৌর্য কিন্তু ভালো ছেলে। সৎ। তোমাকে ভালোবাসে।

- সৎ বলেই তো ঠকাতে চাই নি। ও যে আমাকে ভালোবাসতে চেয়ে নিজেকে ভোলাচ্ছিল। কতদিন ভোলাতে পারত? শেষের দিকে আমি আর পারছিলাম না জানো। ও আমার কাছে উষ্ণতা চাইত আমি দিতে পারতাম না।

- সেটা ওকে বলেছ?

- কি বলতাম? সব কি বলা যায়?

- জন্মদিনে তোমাকে উইশ করল, একটাও জবাব দিলে না? পারলে? 

- হুম। মন শক্ত। ওই যে সেদিন লিখলাম যে - 

 " প্রিয় মানুষের বুকের মাঝে

    উঠছে ফুটে যে কথাটা

    ভালোবাসা আর ফিরতে ডাকা,

    আমি যে আজ ভালো বেসেছি

    একলা থাকা।"

 - সত্যিই ভাববে না নিজের জন্য?

 - না।

 - আচ্ছা, যা খুশি তাই করো।

 - বেশ।

 - আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে কুর্চি।

 - এখন‌ই যাবে?

 - হুম। যাই।

 - যাই বলতে নেই। বলো আসি।

 - আচ্ছা আসি।

 - হুম।


ঘরের বাতাস স্বাভাবিক। জমাট সুগন্ধ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। পাশ ফিরে শুলো কুর্চি। চোখ বন্ধ করে বাকি রাতটুকু পার করার চেষ্টা। তিনটে বাজল বোধহয়। কি  জানি বাকী রাত ওর চোখে ঘুম এনে দেয় কি না। গভীর ঘুম.


পর্ব_২

আবার একটা দিন গড়িয়ে গেল যান্ত্রিকতার চাকায়।কুর্চির ঘরের দেওয়াল ঘড়িতে দু'টো বাজতে যায়। আজ আর তার ঘর নিস্তব্ধ নয়। ফোনে বাজছে সেতারের সুর, মৃদু অথচ সুর মুর্ছনায় আকুল করে দেয় দেহ মন। বাদ্যযন্ত্রী কুর্চির ছোটবেলার বান্ধবী তমালিকা। প্রিয়বন্ধুর জন্য সুর গুলো বন্দী করে পাঠিয়েছে ফোনের‌ অন্য প্রান্তে।

সুরের আবেশে কখন যে তার কন্ঠ সাড়া দিয়েছে তা সে নিজেই জানে না। মনের অস্তিত্বকে যেন মিশিয়ে দিয়েছে গানের সাথে। গান তো সাধনার ই স্তর। সুর যেন অমলিনতার দ্যোতক।

"আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,

পরানসখা বন্ধু হে আমার..."

ক‌ই বাইরে তো ঝড় ব‌ইছে না। কৃষ্ণ‌ ত্রয়োদশীর একফালি চাঁদ টাও মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। তবু শান্ত পরিবেশ। ঘরের আবহাওয়া ভারী, বাতাস গুলো জমাট বেঁধে আছে, ব‌ইছে না তো! ঝড় কোথায়? তবে কি সেই ঝড় কুর্চির মনেই বাসা বাঁধল। এ কিসের আকুলতা?

কেমন এ আত্মমগ্নতা? "সুদূর কোন্‌ নদীর পারে, গহন কোন্‌ বনের ধারে"....

হঠাৎ থেমে গেল গান। পাশ থেকে ভেসে এলো বহু কাঙ্খিত কন্ঠস্বর।


স্বপ্নেশ- কি হলো থেমে গেলে যে?


কুর্চি - কখন এলে? টের পেলাম না!


- তন্ময় হয়ে গাইছিলে যে। যাক ঘুমন্ত মুখ না দেখি, গান তো শুনতে পেলাম। 


- হুম। আজ অন্যের কথা টেনে এনো না। তোমার কথা বলো আজকে।( সুর টা বন্ধ করে দিন কুর্চি। ঘরটা নিঃস্তব্ধতায় গ্রাস করল। কেবল জেগে র‌ইল দুটি কন্ঠস্বর)


- আমার কথা? নতুন করে কি বলব।সব‌ই তো জানো।


- না, সব জানি না। যা জেনেছি বাইরে থেকে জেনেছি, সেই জানাটুকুই সব জানা নয়‌। আমি তোমাকে জানতে চাই।


- আমাকে? আমার আমি টাকে জানতে গেলে যে আমার মুখের কথায় জানতে পারবে না কুর্চি। অনুভব করো আমায়, সময় নাও।


- সময়? সেই সময়ের যে বড়ো অভাব আমার কাছে। ওই জানার সময়টুকুর সীমায় যদি তুমি আর না আসো?


- নিজের ওপর একটুও বিশ্বাস নেই তোমার?


- আচ্ছা তুমি তো কথা দিতে পারো, যে তোমাকে জানার সময়টুকু তুমি আমায় দেবে‌।


- আমাদের যে কথা দিতে নেই কুর্চি।


- হুম জানি তো, কথা দেবে কেমন‌ করে, যারা শূন্যে হারাতে চায় তারা কি আর কথা দিতে পারে?


- এতো অভিমান আমার উপর!


- এই নাম হীণ সম্পর্কের এটুকুই তো বাঙময়।


- তুমি কি নাম চাও? পারবে না অনামেই খুঁজে নিতে?


- পারব বলেই তো রোজ পুড়ি। ওই যে সুনীল বাবুর...

'"আগুন দেখে আলো ভেবেছি

আলোয় আমার হাত পুড়ে যায়"


- আচ্ছা কুর্চি, আমি যদি আগে তোমার দিকে হাত বাড়াতাম, তুমি কি আসতে আমার সাথে?


- যদি তেমন‌ করে ডাকতে আমায়, নিশ্চয়ই যেতাম। কিন্তু তোমার কি এত সময় ছিল? 


- পারতে অনিশ্চিত স্রোতে ভাসতে?


- তোমার কি আমাকে ১২-১৩ বছরের বালিকা মনে হয়? আবেগে ভেসে চলেছি? মনের কথা জানি বলেই বলেছি, আর স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে ভয় পাই না।


- হুম...


- আচ্ছা আমাকে তোমার দেশ দেখাতে পারো?


- না কুর্চি সেই ক্ষমতা আমার নেই।


- কে বলল নেই? "আড়ালে থেকেও হৃদয় ছুঁতে পারা

সব ক্ষমতার চেয়ে দামী"। তাছাড়া আমার সে দেশ দেখার চোখ আছে।


- তাই? তবে তোমার চোখেই দেখি।


- সে দেশ একটা মেঘের মতো নরম খোলায় তৈরী। দেশে প্রবেশের দরজা ঝিনুকের মালা দিয়ে সাজানো। সেখানে শব্দ নেই। অনুভুতিরা গন্ধ ছুঁতে পায়। তীব্র কিন্তু স্নায়ুকে অবশ করে না। সেই দেশের সরোবর পদ্ম দিয়ে ঘেরা আর বাগানে কেবল‌ই ফোটে পারিজাত। সেই দেশে সব‌ই কোমল কেবল একজন আছে তার হৃদয়টি কঠিন। সেই আমার সন্মুখে আছে, অথচ একদিনের জন্যেও সে আমাকে তাকে দেখতে দিল না।


- নয়নের মাঝে যে আছে তাকে নয়নের বাইরে পাবে কেমন করে?


- ..........


- আচ্ছা সেই কঠিন হৃদয়টি এবার যে ছুটি চায়।


- ছুটি!


- আজকের মতো। যাই বলব না। আসি?


- আমার জন্য তোমার সময় তো স্বল্প সীমাতেই আবদ্ধ। আচ্ছা এসো। 


ঘর আবার আগের মতো স্বাভাবিক, অপার্থিব সেই গন্ধ বাতাস পৌঁছে দিয়েছে সেই লোকে।

সুর টা আবার চালালো কুর্চি।

রাতের স্তব্ধতা খানখান করে বেজে ওঠে সেতার।

পরাণ সখার অভিসার কি ঝড়ের রাতেই হয়?

মনের ঝড়....


পর্ব_৩

কালের নিয়মেই রাত এলো আবার। অবশ্য এই রাতটুকুর‌ই তো অপেক্ষা কুর্চির । তবে এ অপেক্ষা কি শুধুই কুর্চির, অন্যপারে কি এই অপেক্ষা নেই? আকাশের চাঁদের ফালি আরো সরু, তবু যেন তার অল্প আলো দিয়ে চেষ্টা করছে নিবিড় অমা কাটানোর। অন্ধকার আর আর এই সামান্য আলোর খেলায় আকাশটা কেমন ধোঁয়াটে হয়ে আছে। থমথম করছে চারদিক। অথচ এই চাঁদ টাই একদিন বাদে আবার একি রূপে ফিরবে। প্রতিপদের শুক্লপক্ষের আলোয়।


কিন্তু আজ কুর্চি কেমন অস্থির। কপাল বেয়ে একটা যন্ত্রনা থেকে থেকে মাথার শিরা গুলিতে গেঁথে বসছে যেন। একটানা নয়। কিন্তু তিরের মতো বিঁধছে।


ঘরের বাতাস জমাট বেঁধে উঠছে, কুর্চি জানে তার সেই প্রিয় কন্ঠস্বর শোনার সময় এসে গেছে, আর সেই ব্যাকুল করা সুবাস। 

কিন্তু অপেক্ষা করল না ও, আজ মনেহয় নিজেকে নিজেই হারিয়ে ফেলেছে।


কুর্চি- এসেছ?

স্বপ্নেশ-....

- সাড়া দাও....

- .........

- কি হলো? সাড়া দেবে না আমার ডাকে?

- আমাকে একটু সময় দাও কুর্চি। আজ এত চঞ্চল কেন?

- জানিনা। তবে আজ তোমাকে সেই কথাটা বলতে ইচ্ছে করছে, যা তোমাকে বলতে চেয়েও বলতে পারিনি। আমার মনের কথা।

- বলো।

- সন্ধ্যাবেলার চামেলী ন‌ই,

  ন‌ই সকালবেলার মল্লিকা,

  ন‌ই আমি গন্ধমাখা আমের মঞ্জরী।

  ওগো, পথভোলা পথিক তুমি আমায় সঙ্গে নেবে কি?


- কি বলছো তুমি?

- কেন সত্যি কথাই বলছি। নিয়ে যাবে আমায় তোমার সঙ্গে?

- আমি তো নিতে আসিনি কুর্চি। আমি তোমাকে তোমার পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিতে এসেছি। তাছাড়া তোমার পৃথিবীটা

এত রঙিন। তুমি সব ছেড়ে আসতে চাও কেন?


-আমি আর রঙ চাই না গো‌। বড্ড বেশী রঙিন যে‌। দূর পাহাড়ের ওই সবুজ বন কত রঙে সাজানো। তার চেয়েও বেশী রঙ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে মানুষ এই পৃথিবীটা। আমি আর র‌‌ঙ চাই না। যেখানে হাত দি সেখানেই রঙ আর রঙ। লাল, নীল, হলুদ, সবুজের মারামারি সর্বত্র। আমি যে পালিয়ে বেড়াই।‌পালাতে পালাতে আমার পৃথিবী ধূসর হয়ে গেছে।

-ধূসর.... !

-হ্যাঁ। আমি যে আলো চাই আলো। দিতে পারবে আমায় সেই আলো?

-আমি কেমন করে দেব তোমায় সেই আলো?

-কেন তুমি তোমার জীবন দিয়ে যে জ্ঞান আহরণ করলে, তার থেকে কিছু অন্তত আমায় দাও।

-জ্ঞান কি এমন ভাবে দেওয়া যায়? 

জ্ঞান তো তোমার অন্তরেই সুপ্ত আছে। তুমি তার সাধনা করো। সেই জ্ঞানের আকর‌ই তোমায় আলো এনে দেবে। 


-আমি পারব সেই দুয়ার উন্মুক্ত করতে?

-নিশ্চয়‌ই পারবে‌।

-আচ্ছা তুমি আমার সাথে থাকবে তো?

-.......

- আচ্ছা তোমার কখনও আমার কাছে আসতে ইচ্ছে করে না?

- .......

- ইচ্ছে করে না হাত বাড়াতে?

- আমাদের যে ইচ্ছে করতে নেই।

- আমার যে খুব ইচ্ছে করে আমার ধূসর পৃথিবীটা তোমার পৃথিবীতে মিশিয়ে দিতে। ধবল, শান্তির আর আলোর।

- আমার পৃথিবী ধবল কে বলল তোমায়!

- আমি জানি। আমার দেবতাই আমায় চিনিয়েছে। 

- কে তোমার দেবতা?

- সীমার মধ্যে অসীম যিনি‌। যিনি নিয়মের চেয়েও মনকে বেশী জানেন। তিনিই তোমাকে নিয়ে আসেন আমার কাছে।


- কি বলছো এসব!কোন্ পথে পা বাড়িয়েছো তুমি? এ পথ কখনো মেলে না কুর্চি। তোমার কল্পনার চোখে অনেক মায়া। আমাকে যে মায়ার বাঁধনে আটকাতে নেই।


- কেন মেলে না পথ?

- এই পথটুকু পার হতে আমাকে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়। তুমি এমন পথে পা বাড়িও না।

- ভয় পাচ্ছ? এর চেয়ে বেশী কষ্ট হয়ত আমি পাচ্ছি।

- এতো আবেগ কোথায় রেখেছিলে? মনের কোন গহীনে লুকিয়ে ছিল এই টান?

- সেই আবেগের সন্ধান আমি নিজেই তো পেয়েছি অনেক পরে। আঘাত‌ই আমাকে খুঁজে দিয়েছে। 

নাইট্রিক অ্যাসিড বাষ্প যখন তপ্ত কপার ছোঁয়.....

- কিন্তু তোমার জন্ম-মূহুর্ত থেকে প্রতিটা নিঃশ্বাস, হৃদয়ের সংকোচন- প্রসারণ সব কিছু নির্দিষ্ট, তাকে খন্ডাবে কেমন‌ করে? জোর করে সেই হিসাব মুছতে চাওয়া শুধু অন্যায় না পাপ।

- আমি তো জোড় করে মুছতে চাই নি কিছু। হয়তো সেই হিসাব শেষের পাতায় পৌঁছে গেছে।

- আজকে আমায় যেতে দাও কুর্চি। তুমি আমায় মায়ায় বেঁধে দিও না। আমি ডাকতে পারিনা তোমায় এমন করে। আমরা যে ভিন্ন লোকের বাসিন্দা। আমায় যেতে দাও।

- তবে মন বাঁধল কেন এমন করে? মায়ায় এত ভয় কেন তোমার? যদি এই জগতের নিয়মে পরিবর্তন আসে তবে আসুক। যে পরিবর্তনে মনের সায় থাকে তাকে এত ভয় কেন তোমার?

- ........

- কি হলো? কিছুই বলবে না?

- ......

- কি হলো সাড়া দাও....!

- .....

স্বপ্নেশকে ডাকতে ডাকতে হঠাৎ খেয়াল হলো পরিবেশ আগের মতো নেই। মাথার যন্ত্রনাটা ফিরে এলো আবার।

দুহাত দিয়ে মাথার রগটা চেপে ধরল সে, চোখের কোণ দিয়ে জল ঝরছে, আর ঘরের মধ্যে ঘুরে ফিরে বেড়াতে লাগল একটাই কথা। মায়ায় এত ভয় কেন তোমার?


সত্যিই তো এত ভয় কেন মায়ায়..... তবে কি সেও মায়ায় বেঁধে ফেলল নিজেকে? 


 শেষ পর্ব

আজ অমাবস্যা। আকাশটা আজ ফাঁকা। যদিও শহরের আকাশে সবসময় ধোঁওয়াশার চাদর বিছানো থাকে, তবে আজ আকাশ বেশ পরিষ্কার। যেন এক বিশাল কালো চন্দ্রাতপের মধ্যে চুমকির মতো জায়গায় জায়গায় একটা দুটো তারা ফুটে উঠেছে। আর তার ঠিক মাঝখান দিয়ে ব‌ইছে দুধসাদা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ।
এ যেন তারাদের বাড়ী। জানলা দিয়ে আকাশ দেখছে কুর্চি। এই আকাশ দেখতে সে ভয় পায়। এই অসীম গাম্ভীর্য তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাকে যেন দেখে যেতে বলে সৃষ্টিতত্ত্বের এক জটিল রহস্য।আজ ও আকাশ দেখছে আর ওর মন কি যেন হাতড়ে চলছে অনেকক্ষণ ধরে, যেন একটা গানের সুর, না কি তার কথা।
হঠাৎ ভরাট গলায় ভেসে এলো একটা গান। কোনো যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়াই সুর,লয়, তালের কোনো বিচ্যুতি নেই। এই গানের গায়কীতে আছে একটা আবিষ্ট করার ক্ষমতা। 

"তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই--

     কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই ॥

    মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ,   দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ,

   তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই॥"......

রবিঠাকুরের গান একটা স্বর্গীয় পরিবেশ রচনা করল। মন প্রাণ দিয়ে শুনল কুর্চি সেই গান। গান থামল একসময়। আবিষ্ট মন নিঃস্তব্দতা ভঙ্গ করতে সায় দিল না ওর। কিছুক্ষণ অতিবাহিত।

তবে কুর্চিই প্রথম নিরবতা ভাঙল‌।

কুর্চি- এই তো বেশ গাইলে। তবে যে বল তোমার গান সুর লোকের সুরে বাঁধা পরে আছে। তোমাকে গাইতে নেই?

স্বপ্নেশ- হিতকর কাজের জন্য আমরাও কখনও কখনও নিয়ম ভাঙি কুর্চি।

- হিতকর কাজ?
- হ্যাঁ। আজ আমি তোমাকে কিছু কথা বলব। কথাগুলো হয়তো তোমাকে আঘাত দেবে। আশা করি সেই সত্য মেনে নিতে তুমি পারবে।
- কোন‌ সত্য!
- দেখো কুর্চি আমি তোমার কাছে এসেছিলাম তোমাকে ফিরিয়ে দিতে তোমার জগতে‌। তোমার আকুল আকুতিই আমাকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছিল, তুমি নিজেই জানো না কি তার জোর। তবে আমি চাইলেই তোমাকে আমার সাথে ডেকে নিতে পারতাম, এ ক্ষমতা আমাদের আছে। আমি তা চাই নি। কিন্তু তবু আমি আসতাম তোমার কাছে।
- কেন‌ আসতে তবে?

- কারণ তুমি একটা মায়া দ্বীপের মতো। তোমার কাছে এলে স্নিগ্ধ ছায়া পাওয়া যায়।

- কি বলছ তুমি!

- তবে কুর্চি তুমি তোমার কল্পনার চোখে তুমি মরণের পারের দেশটাকে যেমন দেখো মৃত্যু কিন্তু তেমন নয়। মৃত্যুর কোনোখানেই কোনো কোমলতা নেই। 
আচ্ছা কুর্চি তুমি কখনও ঘষা কাঁচের অন্যদিকটা দেখেছ?

- হ্যাঁ।

- চিতার গনগনে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে অন্যপারটা ঠিক তেমন লাগে, মাঝে মাঝে সেই দৃশ্যপটটা কেঁপে ওঠে জলের প্রতিবিম্বের র মতো। 
ধরো সেই ভাবে তুমি দেখতে পাচ্ছ তোমার এত দিনের পুরোনো বাসা, তোমার যত্ন দিয়ে গড়া শরীরটা পুড়ছে একটু একটু করে। তুমি পারবে সহ্য করতে? কিংবা ধরো তুমি দেখছো তুমি যাকে আপনার ভাবতে তার মিথ্যে কান্না আর অধৈর্য অপেক্ষা। তুমি পারবে তো সহ্য করতে?

- আমি ভাবতে পারছি না সেই দৃশ্য!

- তুমি যে জগৎ এর সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করতে চাইছো, তা এত সহজ নয় কুর্চি। যে অসীম স্বেচ্ছায় সীমায় আবদ্ধ হয়ে আছে, সেই সীমার বন্ধন এত সহজে কাটে না। তাই মৃত্যু সুখের সাথে আসে না অনেক যন্ত্রনা দিয়ে আসে। যাঁর স্বেচ্ছা মৃত্যু বর আছে তিনিও যন্ত্রনা স্বীকার করেই মৃত্যু কে আলিঙ্গন করেন।

- কিন্তু তার পর তো অবিচল‌ শান্তি।

- যে শান্তির পথে অনেক স্তর‌ আছে।

- কেমন সে পথ?

- তার বর্ণনা করা যায় না। কোথাও তীব্র আলোর ঝর্না ধারায় স্নান করিয়ে দেবে। কোথাও মহাশূন্যের অন্ধকার। কোথাও প্রবল ঝড়, কোথাও শব্দের‌ কম্পন। তবে কুর্চি তোমাকে নিজের জগৎ এ ফিরতে হবে।

- ফিরতে হবে মানে?

- তুমি এ জগৎ এর বাসিন্দা, কিন্তু তোমার মন মরণের পারে সমর্পিত। এভাবে চলতে পারে না। তোমার আত্মা দেহ কে মুক্তি দিতে প্রস্তুত নয়। তাই তুমি কোনো জগৎ এই পৌঁছতে পারবে না। তাই এই পৃথিবীর দিকে ফেরো। ধূসর পৃথিবীতে এখনও কত আসল রঙ লেগে আছে। চোখ মেলে দেখো।

- আসল রঙ?

- হ্যাঁ।স্বপ্ন দেখো কুর্চি স্বপ্ন। এই স্বপ্ন‌ই তোমার জন্ম ঋণ শোধ করতে সাহায্য করবে। 

- জন্ম ঋণ!

- হ্যাঁ, এতো সুন্দর পৃথিবীতে জন্মেছ তার জন্ম ঋণ শোধ করবে না? স্বপ্নগুলোকে সত্যি করো কুর্চি। স্বপ্ন ছেড়ে যেও না। যত ক্ষুদ্র স্বার্থেই লাগুক না কেন‌ তোমার জন্য সেটুকুই নির্দিষ্ট। সে কর্ম সমাপন না করে মুখ ফিরিয়ে থেকো না। এ বড়ো অপরাধ।

-  বেশ। তবে তুমি সাথে থাকো আমার।

-  না কুর্চি। তা হয় না। আজ প্রথম তোমার কাছে কিছু চাইব দেবে আমায়?
-  কি চাও?
-  বিদায়। 
-  কি?
-  হ্যাঁ কুর্চি।
-  আর আসবে না?
-  আসব। তোমার আত্মা এই জন্ম থেকে মুক্তির পথে। যেদিন তোমার জীবনের যাত্রা মৃত্যুর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াবে, সেদিন আমাকে ডেকো, আমি আসব। তবে এবার বিদায় দাও।
-  সত্যি চলে যাবে?
-  হ্যাঁ কুর্চি। তবে আমায় পিছু ডেকো না।
-  ফিরবে না?( চোখে জল)
-  আমায় ডেকো না। আমি তোমার ডাক ফেরাতে পারি না। আমায় আর  ডেকো না.......
-  যাবার আগে আসি বলে যাও।
-  ............
-  যাবার আগে অন্তত একবার আসি বলে যাবে না?....

কান্নায় ভেঙে পড়ল কুর্চি। বালিশের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে। কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে। 

আমরা ওকে কাঁদতে দি। কাঁদুক। যত আবেগ জমা হয়ে আছে ওর বুকের মাঝে জল হয়ে বেরিয়ে যাক। ভিজিয়ে দিক ওই ছায়া পথ। নক্ষত্র চালিত ওই পথ দিয়ে যেতে যেতে একবার ফিরে দেখুক সে, তার কুর্চির জন্যে ফেলে রাখা অপার্থিব সুঘ্রাণে ভরে থাকুক ঘর।

কুর্চি দু'রাত হয়তো কাঁদবে, তারপর ওর জীবনে আসবে নতুন ভোর। একদিন হয়ত ফেলে রাখা থিসিস পেপারটা শেষ করবে, জমাও দেবে ঠিক মতো। বুঝতে শিখবে অসীমের দেবতার থেকে দূরে সরে যাবার ভুলটা। তার হিসাবের বাইরে যেতে চাইবে না আর। পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শিখবে। হয়তো বাকী থাকা উপন্যাসটাও শেষ‌ করবে একদিন।

তবে আজ যে মাথার যন্ত্রনা ওর ছিল না। সেটা একদিন স্থায়ী হবে। আস্তে আস্তে তীব্রতা বাড়বে। ভিতরে অবাঞ্ছিত কোষগুচ্ছ বৃদ্ধি পাবে, ভিতর থেকে পোড়াবে ওকে। কত দিন.... তিনমাস... ছয়মাস... বড়োজোড় এক-দু বছর। মৃত্যু আসবে। অনেক যন্ত্রনা নিয়েই আসবে। কিন্তু ততদিন সে বাঁচবে, প্রাণভরে বাঁচবে আর জ্ঞানের সাধনা করবে। তারপর হয়তো একদিন এই সংলাপ সমাপ্ত হ‌বে। ওপার রজনীগন্ধার ক্ষীণ আশ্বাসটুকু আছে যে‌।
(সমাপ্ত)

অঙ্কনে গৌরী রায়

No comments