একেলা কোন পথিক তুমি
পর্ব-১
বাড়িটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে আদি। বহু চেনা এ বাড়ির ইট কাঠ পাথরের প্রতিটা স্মৃতি এত উজ্জ্বল, মনের অলিন্দে যার নিশ্চিত আনাগোনা। এর সদরের শেষ সিঁড়িটি থেকেই শুরু হয়েছে তার বিচিত্র জীবনের যাত্রাপথ। উল্টোদিকের ফুটপাতে দ্বন্দের দোলাচালের
মধ্যে দাঁড়িয়ে সে; বাড়িটির ভিতরে কেমন অভ্যর্থনা পাবে তা জানে না, যে বদনাম মাথায় নিয়ে হারিয়ে ফেলেছিল এই আশ্রয় তার ভার যে এতবছরেও হালকা হলো না। এই নিয়ে তিন দিন হয়ে গেল এখনও ঠিক করতে পারলো না কি করবে? কেউ চিনতে পারবে ওকে? না পারছে ভিতরে ঢুকতে, না এড়িয়ে যেতে। কেবল মনে হচ্ছে দোতলার বা দিকের শেষ জানলাটা দিয়ে একটা মায়াবী মুখ উঁকি দেবে তারপর উচ্ছল হাসিমুখে হাতছানি দিয়ে ডেকে বলবে ' কি রে আদি এই ঠা ঠা রোদ্দুরে বাইরে দাঁড়িয়ে কী করছিস? ভিতরে আয়।' শেষ কথাটায় আদেশ স্নেহ মিলেমিশে একাকার।না তেমন করে কেউ ডাকলো না। বারবার জানলাটার দিকে সতৃষ্ণ চেয়ে থাকা সার। কেউ নেই ওকে ডাকার। একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের ভিতর লুকিয়ে ফেরার পথ ধরবে ঠিক সে সময়ে এক নারী কন্ঠ শুনল, ' কী ব্যাপার বলুন তো? চেহারা দেখে তো ভদ্রলোক বলে মনে হয়, আর মনে তো হয় না উঁকি ঝুঁকি মেরে মেয়ে দেখবার বয়স আপনার আছে।'- 'মানে?' বিরক্ত এবং কিছুটা আশ্চর্য ও হলো আদি। একটা ১৭-১৮ বছরের ছোট মেয়ে তার সাথে হঠাৎ এভাবে কথা বলছে কেন!- ' সেই তো! এখন তো আবার কিছুই জানেন না এমন ভাব করবেন।'- 'দেখো আমি তোমার থেকে বয়সে বড়ো, সম্মান দিয়ে কথা বলো।' একটু রেগেই বলল।- ' বড়ো বড়োদের মতো থাকলেই হয়। দুদিন ধরে আপনাকে লক্ষ্য করছি আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকছেন আর আমার ঘরের জানলার দিকে নজর রাখছেন।' গলার স্বর বেশ দৃঢ় মেয়েটির তবে মিষ্টতা আছে।এবার অস্বস্তিতে পড়ে গেল আদি। ' আসলে আমার এক পরিচিতের বাড়ি এদিকে ছিল, সেই বাড়িটাই খুঁজছিলাম।'কথাটা বলেই বুঝলো একেবারেই খেলো হয়ে গেছে যুক্তিটা। মেয়েটির ভ্রু'কুঞ্চনে বোঝা যায় সে আদৌ একথা বিশ্বাস করে নি। আর সময় নষ্ট না করে হনহন করে হাঁটা দিল সেখান থেকে। মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে আদির ওভাবে চলে যাওয়া দেখল। ' আজব লোক তো!'খানিকটা পথ পেড়িয়ে রাস্তার মোড়ে এসে থামলো। নিজের ওপর কেমন লজ্জা হচ্ছে কিন্তু কি করতো তখন? মেয়েটা যেভাবে জেরা করছিল। জিজ্ঞাসা করলে যদি বলতো, যে এই বাড়িতে পিনাকী বসু রায় কিংবা সোমনাথ বসু রায় বলে কেউ থাকে না। তাহলে কি আদি সেটা মেনে নিতে পারত? একেবারেই শিকড় ছিন্ন হলে ও বাঁচত কি নিয়ে?স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগলো আদি। এই পড়ন্ত বিকেলে ছায়া ছায়া এই স্টেশনের রাস্তা মনটাকে আরো উদাস করে দেয়। ভিতরে শূণ্যতার কালো হাঁ আস্তে আস্তে গিলে ফেলছে। তবে কি কেউ রইল না আর। বাড়িটার সাথে মাত্র দুটো বছরের সম্পর্ক, তবু কত হাজার বছরের চেনা, রক্তের টান যে। স্টেশনে আসতেই ফেরার ট্রেন পেয়ে গেল আদি; ফেরা? সত্যিই কী ফেরার যায়গা আছে তার? সেই গৃহকোণ, সেই নরম হাতের মা মা স্পর্শ।
(চলবে...)
Post a Comment