আতঙ্কের আড়ালে
#পর্ব_১
ব্যালকনি থেকে একটা শিশু কন্ঠের খিলখিল হাসির শব্দে ঘুম ভাঙলো তানিয়ার। পাহাড়ের নভেম্বরের ঠান্ডায় লেপের তলা থেকে হাত বের করতেই জমে গেল ও। কষ্ট করে উঠে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল রাত একটা।
কিছুক্ষন পর শুনল একটা মহিলা কন্ঠ, "oh My Baby! My heart, say mamma." তারপর শিশুর আধোআধো উচ্চারণ "Da Da Da". আবার সেই মহিলা বলে উঠল "No, Baby, say mamma". বাচ্চাটা আবার বলছে "da da da"
বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সব কিছু। আশ্চর্য হলো তানিয়া। এই Covid-19 Pandemic এ হোটেল একদম ফাঁকা ছিল। এর মধ্যে পাশের রুমে কখন লোক এলো! কৌতুহল দমন করতে না পেরে ওভার কোট টা চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে আসতেই টের পেল ঠান্ডা হাওয়া তলোয়ারের ধারে গায়ে বসে যাচ্ছে। সামনে দেখল এক বিদেশিনী আর ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে একদম রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। বেশ ভালো লাগছিল ওর, মা আর শিশুর এই খেলা দেখতে।
মা বলছে " do you love me?"
বাচ্ছাটা বলছে "yeeea"
-"Ok baby, say mamma"
-"da da da..."
হেসে ফেললো তানিয়া, যদিও ওর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, বাচ্চাটার মুখটাও দেখতে পাচ্ছে না। আলাপ করবে বলে দুবার 'hey' বলে ডাকল। কিন্তু ওর কথা সম্ভবত শুনতে পায়নি। নিজেদের মধ্যেই মশগুল। হঠাৎ দুম করে এক বিভৎস আওয়াজে কেঁপে উঠল ও। খুব কাছেই কেউ বোম ফাটাল। চমকের কিছুক্ষন পরেই শুনল ওই বিদেশিনীর আর্তস্বর "oh.. no... Oh.. God", ঠিক তারপরেই অনেকগুলো নারী- পুরুষের মিলিত হাসির আওয়াজ পেল। শুনে বুঝল আওয়াজটা ওর পাশের রুমের পরের রুম টা থেকে আসছে। বুঝতে পারল ওখানে কেউ বদ্ধ ঘরের মধ্যেই চকলেট বোম ফাটিয়েছে। বিরক্ত লাগল তানিয়ার, অভদ্র লোক সব। হঠাৎ খেয়াল হলো মহিলাটার দিকে, সে রেলিং এর ওপারে খাদের দিকে ঝুঁকে সমানে চিৎকার করছে oh !no...my baby.... My Maria.... বুকটা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। বাচ্ছাটা পরে যায়নি তো! এগিয়ে দেখতে যাবে ঠিক তখনই মেয়েটির পাশের ঘরটা থেকে বেশ কয়েকজন বিদেশি নারী- পুরুষ what happened dyani বলতে বলতে ছুটে এলো, সবার চোখে- মুখে ভয়ের ছাপ। মেয়েটি তখনো চিৎকার করছে, ওর চিৎকার পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এক মর্মান্তিক স্বর। হঠাৎ দলের মধ্যে থেকে একটা ছেলে বলে উঠল, " don't worry guys, it's just for fun, it's a prank".... শুনেই মাথাটা আগুন হয়ে গেল তানিয়ার। এই নতুন এক ফাজলামি শুরু হয়েছে, prank, মানুষকে বোকা বানিয়ে কি সুখ পায়? বাচ্চাটা যদি সত্যি সত্যি পড়ে যেত!
এদের এই হট্টোগোলে ঘুম হবে না ওর। অথচ আজকে ঘুমটা খুব দরকার ওর জন্যে। রুমে ঢুকে দরজা লক করল। তারপর রুমের ফোন থেকে রিসেপশনে ফোন করে দেখল রিং হয়ে যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে শুয়ে পরল ও। বাইরের হট্টগোল তখনও থামেনি। তবে সারাদিনের ক্লান্তিতে এই শীতের রাতে ঘুম আসতে দেরী হলো না। তানিয়ার এই দার্জিলিং এ আসা পারিবারিক ব্যাবসার খাতিরে। দার্জিলিং ম্যালে ওদের একটা কিওরিও শপ আছে। ব্যাবসাটা যদিও ওর বাবাই দেখা শোনা করে। এই বছরে লকডাউনে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এখন খুলেছে। যদিও পর্যটকদের ভীড় এখন নেই তবু একবার নিজেদের এসে সবটা দেখে যাওয়াটা বাবা খুব গুরুত্ব দেন। এখন বাবার অসুস্থতার জন্য ওকেই আসতে হয়েছে। এই দোকানটা খুবই ছোট। মি.ব্যানার্জী পুরোটা সামলে নেন। আসলে কলকাতায় ওদের মেন ব্রাঞ্চ। আজ সারাদিনের জার্নি তারপর কাজ সারতে সারতে বেশ ধকল গেছে। এখানে এলে ওরা সচরাচর যে লজটায় ওঠে সেটা এখনো খোলে নি। তাই বাধ্য হয়েই মাউন্ট ভিউ হোটেলটায় রাত কাটানো। ড্রাইভার দুলাল অবশ্য ওকে হোটেলে নামিয়ে দিয়েই চলে গেছে। কাছেই তার শালীর বাড়ি। কথা আছে সকাল সকাল ওকে হোটেল থেকে নিয়ে দোকানে যাবে। সেখান থেকে দুপুরে কলকাতার দিকে রওনা দেবে।
এতো হোটেলের মধ্যে এই হোটেল টা বেছে নেওয়ার কারণ হলো ওর এক বান্ধবী বছর দুয়েক আগে এই হোটেলের ৩০৫ নম্বর রুমে টায় ছিল। এর ব্যালকনি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিষ্কার দেখা যায় আর খুব ভালো সার্ভিস।
খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো তানিয়ার। পাহাড়ের আবহাওয়ায় এমন একটা কিছু আছে যা আলস্যকে পশ্রয় দেয় না। ওভার কোর্টটা গায়ে দিয়ে ব্যালকনিতে এলো। ভোরের একরাশ টাটকা বাতাস যেন ওকে আভ্যর্থনা জানালো
পাহাড় দিনের। দরজা খুলে সামনে তাকাতেই মুগ্ধ হয়ে গেল সেই সোনার গিরিশৃঙ্ঘ দেখে। সূর্যের আলো কুচি কুচি করে ছড়িয়ে আছে সামনের উপত্যকায়। আর আলোমেখে দাঁড়িয়ে তুষার ধবল কাঞ্চনজঙ্ঘা, খুব কাছে যেন দুহাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারবে।নভেম্বরের ঠান্ডা সোয়েটার, ওভার কোর্ট ভেদ করে শরীরে বিঁধছে। ঠান্ডার দাপটে তন্ময়তা ভাঙল তানিয়ার। ঘর থেকে একটা চাদর আনতে গিয়ে চোখে পড়ল মেঝের উপর পুরু ধূলোর আস্তরণ। মেজাজটা চড়ে গেল তানিয়ার নোংরা একদম সহ্য হয়না। রিসেপসনে জানাবে। হঠাৎ খেয়াল হল আরে! ধূলোর স্তরের উপর কেবল ওর একার পায়ের ছাপ! কাল যে এতগুলো মানুষ বারান্দায় এলো তাদের তো কোনো পায়ের ছাপ চোখে পড়ল না! অবাক হলো ও। এক রাতের মধ্যে তো এত ধূলো পড়ে না। পাশের রুমের দিকে নজর দিতে দেখল দরজায় তালা। ব্যাপার টা ভালো ভাবে বোঝার জন্য এগিয়ে এলো দরজার কাছে , দেখল একটা পুরোনো তালা। মনে হলো দীর্ঘদিন ধরে তালা দেওয়া, তার পাশের ঘরটাও একই অবস্থা। দরজায় একটু ঠেলা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে জমাট অন্ধকার। দরজা দিয়ে প্রবেশ করা আলোয় দেখল ভিতরে মাকড়সার জালের অন্তর্জাল। তিনটে বেড পরপর জোড়া, চারপাশে ছড়িয়ে মদের বোতল গ্লাস। কতগুলি তাস এদিক ওদিক ছড়ানো। কোনো জমাটি আসর হঠাৎ ভেঙে গেছে যেন। গা ছমছম করে উঠল তানিয়ার। তাড়াতাড়ি ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলো। ওর রুমের দিকে পা বাড়াতেই, ওর রুম লাগোয়া ঘরটা থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। ও কাছে যেতেই ঘরের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল। দেখল। ঘরটায় শিশুর ব্যাবহার্য্য না না জিনিস ছড়িয়ে আছে তার সাথে মেয়েদের জামা কাপড়। ঘরের অবস্থা একই রকম জীর্ণ। হতবাক হয়ে নিজের রুমটায় ঢুকলো তানিয়া। ও যেই ওর ঘরের ভিতর পা রাখল ঠিক তখনই সজোরে পাশের ঘর দুটির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ধূলোর আস্তরণ থেকে একটু একটু করে মুছে যেতে লাগল ওর পায়ের ছাপ। শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কোনো রকম দরজাটা লাগিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে খাটে বসে পড়ল।কাল রাতের ঘটনা মেলাতে গিয়েও মিলছে না। বড়ো সরো রহস্য আছে। ঠিক করল খোঁজ নিয়ে জানবে ওর পাশের রুম দুটোয় ঠিক কি কি ঘটনা ঘটেছিল। ভয়ে আর ঠান্ডায় হাত পা জমে যাচ্ছে। একা থাকতে আর সাহসে কুলালো না। কোনোরমে ফ্রেস হয়ে রিসেপশনে চলে এলো। এসে দেখল রিসেপশন ফাঁকা। ওকে দেখে কাঞ্চন তাড়াতাড়ি ছুটে এলো। কাল সন্ধ্যেতেই আলাপ হয়েছে কাঞ্চনের সাথে, খুব চটপটে ছেলে। গেষ্ট দেখাশোনা ও ই করে।
কাঞ্চন এসে বলল 'গুড মর্নিং, ম্যাডাম। কিছু দরকার?'
তানিয়া বলে, ' না কিছু লাগবে না। তোমাদের ম্যানজার কে দেখছি না তো?'
- ' এখন তো বোর্ডার নেই তেমন,তাই উনি এখনো ওঠেন নি। আপনার চা কি রুমে দিয়ে আসব?'
- 'তুমি বরং চা টা এখানেই নিয়ে এসো।'
রিসেপশনের সোফাতেই বসে পড়ল, রুমে যাওয়ার সাহস নেই।
কিছুক্ষন পর কাঞ্চন চা নিয়ে ফিরলে তানিয়া ওকে বলল
-" আমার রুমটার পিছনের বারান্দাটা অপরিষ্কার কেন?
কাঞ্চন উত্তর দিল- " পেছনের দরজাটা খোলা বারণ আছে আমাদের। দরজায় তো তালা দেওয়া আপনি জানলেন কেমন করে?"
তানিয়া অবাক হয়ে গেল- " কে বারণ করেছেন? ম্যানেজার বাবু?"
-" না ম্যাডাম, বারণ করেছেন আগরওয়াল সাব, এই হোটেলের মালিক।"
-"কিন্তু আমি দেখলাম আমার রুমটার বারান্দার দরজার তালা খোলা।"
-"কি বলছেন ম্যাডাম! একদিন আগরওয়াল সাব এসে আপনার রুমের পাশের রুম দুটোর বারান্দার দিকের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে তারপর আপনার রুমের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি আপনার রুমে ঢোকার আগেই চেক করেছি।"
তানিয়ার মনে পরল দরজা দুটো কীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও বলল , "আচ্ছা কাঞ্চন ভাই একটা সত্যি কথা বলবে?"
- "কী কথা?"
- "আমার পাশের রুমটায় অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল?"
- "সঠিক জানিনা। আমি এই বছর জানুয়ারিতে এসেছি।
তারপর তো লকডাউন। তবে ওদিকটায় একা গেলে কেমন গা ছমছম করে।"
-"আচ্ছা। আমার পাশের রুম দুটো কখনো খোলা হয়?"
-"না। স্যারের নির্দেশ রুম দুটো না খোলার"।
-"তুমি ম্যানেজার বাবুকে কিছু জিজ্ঞাসা করো নি?"
-"করেছি। উনিও কিছু জানেন না। আসলে উনিও আমার সাথেই জয়েন করেছেন। এমন কি এই হোটেলের শেফও একই সময়ে এসেছেন।"
-"আশ্চর্য! আর কোনো পুরোনো লোক নেই যিনি কিছু জানেন?"
-" না। এখানে সবাই প্রায় নতুন।"
অবাক হলো তানিয়া, বুঝতে পারল বড়োসরো গন্ডোগোল আছে হোটেল ঘিরে।
কাঞ্চন জিজ্ঞাসা করল " কিছু হয়েছে ম্যাডাম? আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছে?"
তানিয়া কিছু জানালো না। কারণ ও রহস্যের গন্ধ পেয়েছে। ওকে চুপ থাকতে দেখে কাঞ্চন শুধু বলল "আমরা বিশ্বাস করি পাহাড়ের খাদে অপদেবতার বাস থাকে। তাই আমরা আর বিষয়টা নিয়ে ভাবিনি। সচরাচর ওই রুম টা আমরা দিতে চাই না। কিন্তু কাল আপনি এসে জোর করলেন বলেই দেওয়া।"
আর কথা বাড়ালো না তানিয়া। জানে কাঞ্চন কিছু তো নিশ্চয়ই জানে, কিন্তু মুখ খুলবে না। হোটেলের বদনাম আর কেই বা চায়?
কিছুক্ষন পর দুলাল চলে এলো। মনের খটকাটা মনে নিয়েই রুম থেকে ওর ছোট লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দোকানের দিকে। রুম থেকে বেরোনোর সময় দেখল পেছনের দরজায় তালা ঝুলছে।
#পর্ব_২
দোকানের কাজকর্মের ভীড়ে বারবার গতকাল রাত ও আজকের ভোরের ঘটনার কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠছে ও। ব্যাপারটা মি.ব্যানার্জীর চোখ এড়াল না। তিনি জিজ্ঞাসা করতে, সবটা বলল তানিয়া। ও যখন ঘটনাটা ব্যানার্জী বাবুকে বোঝাচ্ছিল সেসময়, ওর দোকানের ঢুকলেন অমলেশ বসু। তিনি শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যাপক। সুযোগ পেলেই পাহাড়ে আসেন। ব্যানার্জী বাবুর সাথে ভদ্রলোকের ভালোই আলাপ।সব শুনে বললেন
"ওই হোটেলের প্রাক্তন ম্যানেজার তুষার ওনার ছেলের বন্ধু। শিলিগুড়িতে থাকে। তবে তিনি যতদূর জানেন ওই হোটেলে গতবছর ডিসেম্বর মাসে একটা বিদেশিনী আত্মহত্যা করেছিল। তারপর পরেই তুষার চাকরি টা ছেড়ে দেয়।"
তানিয়া বলে " আত্মহত্যার কারণ জানা যায়নি?"
অমলেশ বাবু জানান " সঠিক ভাবে জানা যায়নি, হতে পারে ওই মেয়েটি যে গ্রুপের সাথে এসেছিল তাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হয়েছিল, আর মেয়েটার সাথে একটি শিশুও ছিল তার কোনো হদিস পাওয়া যায় নি।পুলিশের অনুমান শিশুটিকে গভীর খাদে ফেলে দিয়ে, মেয়েটি তারপর সিলিং থেকে ঝুলে পড়ে।"
-"পুলিশ কোনো সুইসাইড নোট পায়নি?"
-"সম্ভবত পাওয়া যায় নি। আর কেসটা বিভিন্ন কারণে ক্লোসড হয়ে যায়।"
-" আর গ্রুপের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি?"
-" তাদের পাবে কোথায়? তারা তো বিষয় টা না জানিয়েই চেক আউট করে, পরে হোটেলের লোক জানতে পারে ব্যাপারটা। হোটেলের লোকের অকর্মনতার জন্যই ওরা পালাতে সক্ষম হয়।"
-"তাদের কোনো খোঁজ করা হয়নি?"
-" তাদের কৃতকর্মের শাস্তি উপরওয়ালা দিয়েছেন। পালাতে গিয়ে ওদের গাড়ি খাদে উল্টে পড়ে। পাঁচজন ছিল দলে প্রত্যেকেই স্পট ডেড।"
বিকেল বিকেল বাড়তে ফেরার পথ ধরল তানিয়া। পাহাড়ের প্রকৃতি আর বিশেষ ভাবে টানছে না ওকে। কতগুলো প্রশ্নের উত্তর মেলাচ্ছে ও। ফেরার সময় অবশ্য অমলেশ বাবুর কাছ থেকে তুষার বাবুর ঠিকানা টা নিয়ে নিয়েছে। শিলিগুড়ি গিয়ে জানতে হবে ওকে সেদিনের ঘটনার কথা।
গাড়িতে যেতে যেতে হিসাব মেলাচ্ছে। ওই মেয়েটি ওইদিন রাতে বাচ্চাটাকে নিয়ে ব্যালকনিতে এসেছিল তারপর হঠাৎ বোম ফাটার শব্দ। শব্দে চমকে উঠে মেয়েটির হাত থেকে সম্ভবত শিশুটি পড়ে যায়। তারপর গ্রুপের ছেলেটি হঠাৎ বলে বসে এটা prank. তার মানে পরে সবাই যখন খেয়াল করে বাচ্ছাটি নেই , তখন নিশ্চয়ই কথা কাটাকাটি হয়। আর এত জোড়ালো শব্দে নিশ্চয়ই হোটেলের লোক ছুটে এসেছিল। তারপর কোনো একটা ফাঁকে মেয়েটি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। হয়তো ওই মেয়েটির অতৃপ্ত আত্মা ওখানেই আছে। ভাবনার মাঝেই জানলার বাইরে চোখ পড়তেই হঠাৎ দূর থেকে চোখে পড়ল ওই হোটেলের পিছনের দিক টা। আর একটা ব্যালকনি তে একটা শিশু কোলে নারীর অবয়ব। কতদূর থেকেও দেখল দীপ্ত চোখের দৃষ্টি। যেন কিছু বলতে চায়। ভয়ে গলাটা শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা থেমে গেল। কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না। দুলাল গাড়ির পরিচর্যায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। ও নেমে দাঁড়ালো গাড়ি থেকে। একটা ভয় তাড়া করছে। ওই চোখটা ভুলতে পারছে না। রাস্তার ধারে খাদের দিকে হাঁটতেই দেখতে পেল একটা সদ্য অ্যাক্সিডেন্ট করা একটা গাড়ি। গাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে ছটা দেহ। ভয়ার্ত স্বরে দুলালকে ডাকল ও। দুলাল আসার পর খাদের দিকে তাকাতেই দেখল কিচ্ছু নেই ওখানে সবটা ফাঁকা। মাথাটা ঘুরে গেল তানিয়ার। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসল। আশ্চর্য জনক ভাবেই দুলাল গাড়ি স্টার্ট করতে পারল। তানিয়া শুধু নির্দেশ দিল সন্ধ্যের মধ্যে শিলিগুড়ি ঢুকতে হবে। ওর কিছু কাজ আছে। শিলিগুড়ি তে সেজো পিসির বাড়ি। তাই হোটেলের চিন্তা নেই। তুষার বাবুর সাথে দেখা করতেই হবে। এই মৃত্যু রহস্যের কিনারা আজকেই করতে হবে ওকে।
শিলিগুড়ি পৌঁছে, তুষার বাবুর ঠিকানা খুঁজে বের করতে সময় লাগল না তানিয়ার। ওখানে পৌঁছে ওর পরিচয় দিল। অমলেশ বাবুর থেকে ঠিকানা পেয়েছে সেটাও জানাতে ভুলল না। তুষার বাবুর কাছ থেকে ঘটনা জানতে চাইলে প্রথমে উনি সম্পূর্ণ ভাবে এড়িয়ে গেলেন। তারপর তানিয়া অনেক করে রিকোয়েস্ট করায়, তিনি বলতে রাজি হলেন।
উনি বলেন "ওই দলটায় একটি বাচ্ছা নিয়ে ওরা ছয়জন ছিল। দুটি মেয়ে চারটি ছেলে। ওদের মধ্যে একজন ভারতীয়। সেই গাড়ী ড্রাইভ করছিল সম্ভবত। ওরা পাশাপাশি দুটো রুম আর উল্টোদিকের রুম টা নিয়েছিল। তো সেই রাতে আমি হোটেলে ছিলাম না। অদ্ভুত ভাবে আমার ফোনে আননোন নম্বর থেকে ফোন আসে, আমার বাবা গুরুতর অসুস্থ বলে। বাড়িতে বাবা আর মা ছাড়া আর কেউ নেই। কাকতালিও ভাবে বাবার ফোনটা ওইদিন সকালেই খারাপ হয়েছিল। তাই আগুপিছু না ভেবেই বেরিয়ে পরি,ছোটুর ভরসায়। আর অদ্ভুত ভাবে হোটেলে ওরা ছাড়া সেদিন কোনো গেষ্ট আসে নি। আসলে ম্যালের থেকে একটু দূরত্ব বেশি হওয়ায় আমাদের হোটেলটি পিক সিজন ছাড়া ফাঁকাই থাকে। বছর দুয়েক আগেই তৈরী হোটেলটি। যাই হোক, আমি বাড়ি ফিরে জানলাম কলটি ভুয়ো ছিল। ভোর বেলা ছোটুর ফোন পেয়ে ওখানে পৌঁছে দেখি ঝুলন্ত লাশ।তারপর পুলিশ কে খবর দি।"
এই পর্যন্ত বলে থামলেন ভদ্রলোক।
তানিয়া বললো " আপনি কোনো সুইসাইড নোট পান নি?"
- "তখন আর মাথা কাজ করে নি। প্রথমে পুলিশ কে তারপর অগরয়াল স্যারকে খবর দি। এরপর পুলিশ এলো, পুলিশ রুমে গিয়ে লাশটা নামিয়ে রুম দুটো সিজ করে দিল। এরপর শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ। আমাদের রাঁধুনি আর থেকে জানলাম আগের দিনের ঘটনা।"
- " উনি কি জানালেন?"
- উনি জানান " যে তিনি আগের রাতে একটা বোম ফাটার আওয়াজ পান। তারপর বেশ শোরগোলের শব্দ । উপরে পৌঁছে দেখেন ওই ছেলেমেয়ে গুলোই বোম ফাটিয়েছে আর ওই নিয়েই প্রচন্ড ঝগড়া হচ্ছে। যে মেয়েটা সুইসাইড করল ওই মেয়েটা আর একটা ছেলের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছিল। মেয়েটা ভীষণ কাঁদছিল। পুরো ব্যাপারটা সে ভালো বুঝতে পারে নি, কিন্তু খটকা লাগছিল। আসলে সে ইংরাজি বোঝে না। ছোটু তাকে বলল এসব কিছু নয়, সব ড্রিঙ্ক করে এমন করছে। ওকে রুমে চলে যেতে বলে। সে ও কথা না বাড়িয়ে চলে যায়।"
- "আর ছোটু পুলিশকে কি জানিয়েছিল?"
- "ছোটু বলেছিল ওই ছেলেটি আর মেয়েটির মধ্যে অন্তরঙ্গতা ছিল। সম্পর্কের ভুল বোঝাবুঝি থেকেই ওদের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল। ছোটু নাকি ওদের ঝগড়া থামিয়েই নীচে চলে গিয়েছিল।"
- " সন্দেহজনক"।
- " ছোটুর ওপর আমারো সন্দেহ আছে ম্যাডাম। কারণ ছোটু ছাড়া আর কেউ জানত না আমার বাবার ফোন খারাপ। তাছাড়া পরদিন হোটেলে বসে আছি, পুলিশি জেরায় নাজেহাল অবস্থা। হোটেল ও বন্ধ তাই কাজ নেই। হঠাৎ দেখি ছোটু দৌড়ে দৌড়ে আসছে, মুখে একটাই বুলি, ছোড় দো হামকো ছোড় দো মেমসাব। হামকো ছোড় দো। আমি যখন ছোটুকে জিজ্ঞাসা করছি টি হল? আর কিছু বলে নি খালি উপর দেখাচ্ছে আর বলছে - উও রিভেঞ্জ লেনে আই হ্যায়, মুঝে খতম কর দেহি। বলতে বলতে সেই যে অজ্ঞান হলো তারপর জ্ঞান ফিরলেও আর কোনো কথা বলার অবস্থায় নেই। আমার বিশ্বাস ও অনেক কিছুই জানত। আর মেয়েটির সুইসাইড এর পিছনে গভীর রহস্য আছে।"
তানিয়া সবকিছু শুনে গম্ভীর হয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করল
-" ছোটু এখন কোথায়?"
-" মেন্টাল অ্যাসাইলামে"
-" আপনি চাকরি ছাড়লেন কেন?"
-" ঘটনার ঠিক চার পাঁচ দিন পর, পুলিশ কেস উঠে যাওয়ার পরে, হোটেল খুলবে বলে ঘরটা সাফ-সুতরো করার জন্যে বীরু ওই রুমে গেছিল। কিন্তু ও ভিতরে ঢুকতে যেতেই দুটো দরজা ওর মুখের সামনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বীরু যতবার খুলেছে ততবার একই অবস্থা। বীরু ভয়ে কাজ ছেড়ে নিল। নতুন যে লোক নেওয়া হলো সে ও ঝুলন্ত লাশ দেখল, সুতরাং কাজ করল না। এই সব শুনে রাঁধুনি ও কাজ ছাড়ল। আমি ঘটনা দেখতে গিয়ে দেখলাম রুমে কোনো সমস্যা নেই। যেই পেছনের বারান্দার দরজা খুললাম দেখি বারান্দা জুড়ে ওই মেয়েটি ওর শিশুটিকে কোলে নিয়ে পাইচারি করছে। আমি সেই দৃশ্য দেখেও নড়তে পারলাম না, আমার পা কেউ যেন শক্ত করে ধরে রেখেছে। দেখলাম মেয়েটি বারান্দার অন্য প্রান্ত থেকে হেঁটে আসছে আমার দিকে। কোনোরকমে সর্বশক্তি দিয়ে আমি ওখান থেকে পালিয়ে আসি। তারপর চাকরি ছেড়ে দি। প্রাণের ভয়ে আর কাজ করতে পারি নি।"
বলতে বলতে এই শীতেও ঘেমে উঠলেন ভদ্রলোক। টেবিল থেকে ঢকঢক করে জল খেলেন।
তানিয়া বলল, "সে আপনার কোনো ক্ষতি করত না। হয়ত আপনার কাছে সাহায্য চেয়েছিল।"
তুষার বাবু অবাক না হয়ে পারলেন না। তখন তানিয়া ওর দেখা সমস্ত ঘটনা ওনাকে জানাল। তুষার বাবু বুঝলেন তার কোনো ক্ষতি মেয়েটির আত্মা করত না।
বাইরে বেরিয়ে তানিয়ার মনটা ভারী হয়ে গেল। খারাপ লাগছে dyani র জন্যে। পিসির বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে রাত। খাওয়া দাওয়া করে ও ঘরে এলো। ওভার কোট সকাল থেকে আর দরকার হয় নি, গাড়ির সিটেই পড়ে ছিল। এখন ওটা ব্যাগে ভরতে গিয়ে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ পেল। ভাঁজ খুলে দেখে একটা চিঠি। অবাক হয়ে পড়ল চিঠিটা। চিঠিটা ড্যানির লেখা। মৃত্যুর আগে সে তার স্বামীকে লিখে গেছে। চিঠিটির ইংলিশে লেখা। তার বাঙলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়..
ভালোবাসার আইডান,
তোমার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়ার কোনো মুখ নেই। তাও আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। পাঁচবছর আমাদের বিয়ে হয়েছে। তোমার ভালোবাসা আমাকে ভরিয়ে রেখেছিল তা আগে বুঝিনি। শুধু আগে নয়, আমি কখনোই বুঝতে চাইনি। তোমার ভালোবাসায় প্রকাশ কম, কিন্তু গভীরতা আছে। তোমার কাছে আমি কখনোই সম্পূর্ণ ভাবে ধরা দিই নি। এরপর আমার কোল জুড়ে এলো আমাদের ফুটফুটে কন্যা মারিয়া। মারিয়া আমার বুকের ধন। তবুও তোমাকে ভালোবাসতে চাই নি। আমি তো ভালোবাসতাম, ইভান কে।
ইভানের স্মার্টনেশ, কথা আর সুন্দর নীল চোখ আমাকে মাতাল করে দিয়েছিল। আমি এতটাই সন্মোহিত ছিলাম যে সবকিছু ফেলে, তোমার ভালোবাসা ফেলে, ইভানের সাথে মাত্র একবছরের ছোট্ট শিশুকে নিয়ে আমি সুদূর ইন্ডিয়া ট্যুরে চলে এলাম! ইভান অবশ্য মারিয়া কে কোনোদিন সহ্য করতে পারে নি। আমাকে সরাসরি কিছু না বললেও হাবেভাবে বুঝিয়ে দিত। আমরা যখন দিল্লিতে ছিলাম তখন আরো তিনজন যোগ দিল আমাদের সাথে। ওরা ইভানের বন্ধু। দিনগুলো ভালো কাটছিল বেশ। ওরা ঠিক করল কলকাতায় ওদের একটা ফ্রেন্ড আছে। ওর সাথে দেখা করবে। তাই আমাদের কলকাতা আসা। এরপর এলাম শৈলশহর দার্জিলিং। গতকাল আমরা বিকেল চারটের সময় এই হোটেলে পৌঁছেছি। প্রত্যেকবারের মতোই আমার আর মারিয়ার জন্য আলাদা রুম। তবে ইভান মারিয়ার জন্য আমার সাথে টাইম কাটাতে পারে না এই অভিযোগ সবসময় করে থাকে। তুমি তো জানো মেয়েটা রাতে মোটেও ঘুমাতে চায় না। তখন রাত সাড়ে বারোটার সময় মেয়েটা কেঁদে উঠল। আমি উঠে ওকে কোলে নিয়ে পেছনের বারান্দাটায় ঘুরছিলাম। আমি রেলিং ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ বিকট আওয়াজে চমকে উঠলাম। মারিয়া আমার হাত থেকে অতল খাদে তলিয়ে গেল। যদিও ইভান বলেছে ও prank করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝলাম সবটাই ওদের প্ল্যান মারিয়াকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার। আমি যাতে না বুঝতে পারি তাই এখানে এসে করেছে। আমি আমার মেয়েকে হারিয়ে শোকে মূহ্যমান। তখন আমি ওদের অনেক আলোচনা শুনে ফেলেছি। ওরা আমার পাশের ঘরটায় ছিল। আমি জেনেছি মারিয়াকে মারার প্ল্যান ওর আগে ছিলনা। এখানে এসেই ও ঠিক করে সুযোগ বুঝে মারিয়াকে খাদে ফেলে দেবে। এখন একটা চান্স নিল শুধু। আমি যখন ওকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন করলে এটা? ও আমাকে বলল ও আমাকে নাকি আগে জানিয়ে ছিল এই প্রাঙ্কের প্ল্যানটা। আমি বললাম আমি আমার মেয়েকে নিয়ে এমন কিছু করার কোনো প্ল্যান কখনই করতে দিতে পারি না।
জিশাস আমাকে শাস্তি দেবেন বলেই আমার কোল থেকেই মারিয়া হারিয়ে গেল। নয়তো মায়ের কোল থেকে সন্তান কখনও হারিয়ে যায়? আমার সময় ফুরিয়েছে। আমি আগুনের পবিত্রতা বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি ইন্ডিয়ানরা আগুনকে পূজা করে কেন। আইডান তো আগুনেরই প্রতিক। আমি চললাম আইডান। পারলে ক্ষমা কোরো। আমার দেহ তোমার কাছে পৌঁছলে, যদি পারো আমার কপালে শেষ চুম্বন এঁকে দিও। এতদিন তোমার স্পর্শ কে আমি দূরে রেখেছি, আজ তা আমার কাছে সবচেয়ে দামী।
ইতি- তোমার ড্যানি।
চিঠি টা শেষ করল তানিয়া। চোখের জল দুগাল বেয়ে চিবুক ছুঁয়ে গেছে। অদ্ভুত ভাবে চিঠির নীচে লন্ডনের ঠিকানা লেখা। তানিয়া জানে তার কর্তব্য কি। জিশাসের অশেষ দয়ায় এই চিঠি ইভান অথবা অন্যকারোর হাতে পরে নি। যারা মারিয়ার খুনের সাথে জড়িত তাদের হয়তো ড্যানি নিজেই শাস্তি দিয়েছে। এমনকি ছোটুকেও।
কলকাতায় ফিরে তানিয়া এই চিঠি পৌঁছে দেবে আইডান বেইল এর কাছে। তাকে জানাবে সমস্ত ঘটনা যা ড্যানি তাকে বোঝাতে চেয়েছে। হয়তো তিনি তার স্ত্রী কে ক্ষমা করে দেবেন। তার শেষ ইচ্ছা রেখে তার কবরের উপর রাখবেন শেষ চুম্বন।
।।সমাপ্ত।।
(ঘটনার স্থান, কাল, পাত্র গল্পের প্রয়োজনে কল্পিত। বাস্তবের সাথে মিল থাকলে তার সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও কাকতালীয়।)
-উপাসিকা চ্যাটার্জ্জী
Post a Comment