Header Ads

ad

হিজল ফুলের বন্ধু

হিজল_ফুলের_বন্ধু

-উপাসিকা চ্যাটার্জ্জী

মেহুলের পিসিঠাম্মির বাড়ির পূর্বদিকটায় মিনিট দশেক হাঁটলে একটা  বাঁওড় পড়ে। সম্ভবত কোনো বড়ো নদীর বাঁক এখন আর স্রোত নেই। গ্রামের লোক বলে হিজলতলির বাঁওড়। গ্রামের নামেই নাম। কোন নদীর বাঁক তা আর বলতে পারে না কেউ, নদীটার অস্তিত্বও এখন আর নেই। এই বাঁওড়ের পাড়েই সেই প্রাচীন হিজল গাছটা দাঁড়িয়ে। সেদিন ভোরের দিকে টিপেটিপে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিল এদিকটায়। ভিজে পথের উপর গোলাপী আভার লাল লাল ফুলগুলো পড়ে থাকতে দেখেছিল, বাঁওড়ের জলে ফুলগুলো ভাসছিল, যেন স্বপ্নের বাগান। এত সুন্দর!! জলের ধারেই গাছটাকে একলা একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল, তার মতোই একা। দেখতে দেখতে বাবির উপর অভিমান হয়েছিল খুব। এত সুন্দর জায়গায় বাবি তো আগে কখনও নিয়ে আসে নি। বাবি ওকে সত্যিই ভালোবাসে না। সব ভালোবাসা তো মা কে ঘিরেই। মা... চোখটা জলে ভরে উঠে ঝাপসা হচ্ছিল সামনের সবকিছু, ঠিক তখনই ওই গাছটার পিছন থেকে বেরিয়ে এসেছিল ছেলেটি। ছেলেটাকে হঠাৎ দেখে এতটা অবাক হয়ে গিয়েছিল যে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল মেহুল। 
অপুর মতোই গভীর টানা চোখ কেমন মায়া জাগানো। এত কাছ থেকে অচেনা কারোর দিকে মেহুল যে এমন ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে  পারে সেটা জানা ছিল না। ছেলেটাও অদ্ভুত, মেহুলের অবাক দৃষ্টির সামনে কোনোরকম বিব্রত বোধ করলো না। উল্টে ব্যাপারটা খুব স্বভাবিক এই ভাব করে হাসিমুখে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। ছেলেটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জলার দিকটায় এগিয়ে গিয়েছিল। 
'ঝোঁপের দিকটায় যেও না মেহুল, বর্ষাকাল, সাপ থাকতে পারে।'
সাপের কথাটা কানে যেতেই থমকে ঘুরে তাকিয়ে ছিল ছেলেটির দিকে। আশ্চর্য সন্মোহনী শক্তি চোখদুটোয়। আবার চোখের মায়ায় হারিয়ে যাচ্ছিল মেহুল।
ছেলেটির আশ্চর্য পোশাক, মেহুলের নাম ধরে ডাকা সবটা মিলিয়ে ছেলেটাকে আরো রহস্যময় করে তুলছিল।
' দেবাঞ্জন কে কি সত্যিই পেতে চাও তুমি?'
চমকে উঠেছিল মেহুল। ভয়ে লজ্জায় এক পা এক পা করে পিছু হঠেছিল, তারপর সমস্ত আকর্ষণ ছড়িয়ে ছুটে পালিয়ে এসেছিল বাড়িতে। তারপর কানের মধ্যে সারাক্ষণ বাজছিল এই প্রশ্ন, তাড়া করে বেড়িয়েছে সারাটা রাত।
সরাসরি নিজের মনকে প্রশ্ন করে মেহুল। সত্যিই কি সে দেবাঞ্জনের জন্য এতবড়ো ঝুঁকি নিয়ে ছিল? না কি অদিতিকে দূরে সরিয়ে দিতে?

অদিতির নাম টা মনে পড়লেই গায়ের রক্ত গরম হয়ে যায় ওর। এই মেয়েটা সবসময় জিতে গেছে, সবসময়। একটা কালো খারাপ দেখতে মেয়ে পদে পদে হারিয়ে দিয়েছে মেহুলকে। ক্লাসে ফার্স্ট ,গানের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী অদিতি বিশ্বাস, সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা একটা মেয়ে মেহুলের চেয়ে দামী পেন্সিল  বক্স নিয়ে স্কুলে আসে।  তার বাবা রনজিৎ সেন সফল ব্যবসায়ী, শহরে বিশাল বাড়ি তাদের, যে রনজিৎ সেন ওদের গোটা স্কুলটাকে কিনে নিতে পারে, সেই রনজিৎ সেনের মেয়ে একটা তুচ্ছ সাধারণ মেয়ের কাছে হেরে যাবে এটা কোনোদিনই মানতে পারে না ও। সবচেয়ে খারাপ লাগত রমা আন্টির সাথে অদিতিকে দেখলে। ছোটোবেলায় স্কুল ছুটির পর অদিতি ছুটে রমা আন্টির কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। রমা আন্টিও কত যত্ন নিয়ে অদিতির উস্কোখুস্কো চুল হাত দিয়ে ঠিক করে দিতে দিতে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিত অদিতির কপাল, গাল। আর মেহুল হা করে তাকিয়ে থাকত। চাতকের মতো চেয়ে থাকত, যদি ওই শাখা পরা নরম হাত ওর মাথার ঘেঁটে যাওয়া চুলগুলো পরম যত্নে গুছিয়ে দেয়।
মেহুল বুঝতে পেরেছিল সবচেয়ে দামি জিনিসটা অদিতির কাছে আছে, যা মেহুল হাজার চেষ্টা করলেও ফিরে পাবে না। তারপর থেকেই অদিতি ওর চরম প্রতিদ্বন্দ্বী। অনেক চেষ্টা করেছে অদিতির ক্ষতি করার কিন্তু পারেনি। শেষবার বোর্ড এক্সামের আগে লাস্ট যেদিন স্কুল ছিল, সেদিন মেহুল অদিতিকে তিনতলার সিঁড়ি থেকে ধাক্কা মেয়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বিদিশা ধরে ফেলেছিল অদিতিকে। সিঁড়িতে ভিড় থাকায় কেউ বুঝে উঠতে পারেনি কাজটা কার।

বাবাকে রাজি করিয়ে সবচেয়ে নামী দামী কলেজ বেছে নিয়েছিল মেহুল যাতে আবার ওকে অদিতির মতো সাধারণ মেয়েদের মুখোমুখি হতে না হয়। তবে বিধাতার অদ্ভুত বিচারে আবার অদিতির সাথে দেখা; কেবল ডিপার্টমেন্ট আলাদা। এড়িয়ে চলেছে অদিতিকে। কলেজে দেবাঞ্জনকে ভালো লাগতো মেহুলের। বাবার টাকা আর নিজের রূপ দিয়ে মেহুল তার চারপাশে স্তাবকদের একটা বৃত্ত তৈরি করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের সবার থেকে দূরে থাকা দেবাঞ্জনই ওকে সবচেয়ে বেশী আকৃষ্ট করেছে। 

কলেজে গিয়ে হ‌ইহুল্লোড়ে এতটাই মত্ত হয়ে গিয়েছিল যে অদিতির প্রতি ঈর্ষার জ্বালাটাও অনেকটা কমে আসছিল। রণজিৎ বাবু চূড়ান্ত ব্যস্ততার মাঝে মেয়ের এই লাগামহীন জীবনযাপনে রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করলে ফল হয় বিপরীত। মেহুল আরো জেদি আর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। 

এরপর গতসপ্তাহে আসে সেই বিশেষ দিন। সেদিন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। কলেজ শেষে মেহুলের হঠাৎ খেয়াল হয় বাড়ির গাড়িতে না ফিরে বাসে ফিরবে। সেইমতো বাস স্ট্যান্ডে হাজির হয় জনাকয়েক বন্ধু মিলে। মিলি প্রথম দেখেছিল,
' এই পিছনে দেবাঞ্জন আর অদিতি না!'
মেহুল অবাক হয়ে ঘুরে তাকায়। রাস্তার পাশের এই পার্কটায় দেবাঞ্জনের কাঁধে মাথা রেখে অদিতি ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। ওরা মেহুলদের থেকে পিছন ফিরে বসে তাই দেখতে পারেনি। আর মেহুল স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, চোখের জল এত গরম হতে পারে, যে চোখের জলে গাল পুড়ে যায়, সেদিন প্রথম বুঝেছিল মেহুল। 
' কিরে তোর পরান পাখি যে হাতছাড়া হয়ে গেল এবার। অন্যের খাঁচায় দানাপানি খাচ্ছে।' রাহুলের কথা মেহুলকে সবার সামনে লজ্জায় অপমানে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছিল। সামনের চলন্ত বাসে দৌড়ে উঠৈ সবার থেকে পালিয়ে বেঁচেছিল।

মেহুলের মতো মেয়ে যাকে নিজের করে চায় সে ওই কালো মাঝারি দেখতে মেয়ের সাথে প্রেম করতে পারল কী করে?
অদিতির কাছে এবার কিছুতেই হারবে না ও। সেদিন রাতেই দেবাঞ্জনকে ফোন করে মনের কথা জানায় মেহুল। জানায় তার ভালোবাসার কথা।
' আমি অদিতিকে ভালোবাসি মেহুল।'
উফ্! আবার অদিতি... দেবাঞ্জন এত সহজে বলে দিল!
- ' কিন্তু,আমি যে তোকে অনেক বেশি ভালোবাসি রে দেবাঞ্জন।' মেহুলের গলায় আকুতি।
- - ' শুনতে পেলি না কি বললাম?'
- ' কী আছে অদিতির? না রূপ না গুন। কী দিতে পারবে ও তোকে? আমি বাবিকে বলে তোর ভালো জবের ব্যাবস্থা করে দিতে পারি আফটার গ্রাজুয়েশন।'
- - 'ছিঃ! তুই লোভ দেখিয়ে ভালোবাসা পেতে চাইছিস?'
- ' এভাবে বলিস না। বি প্র্যাকটিক্যাল। লাইফে তো তোকে ভালোভাবে দাঁড়াতেই হবে তাই না।'
- - ' ফোন রাখছি'
- প্লীজ বোঝার চেষ্টা কর দেবাঞ্জন। আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না।' মেহুলের গলায় আকুতি।
- ফোন কেটে দেয় দেবাঞ্জন।
কান্নায় ভেঙে পড়েছিল তারপর। অদিতির ওপর জমানো সমস্ত রাগ মেহুলকে উন্মাদ করে তুলেছিল। দিন দুই পর মেহুলের জন্মদিন। প্রথমবার অদিতি নিমন্ত্রণ পেয়েছিল মেহুলের বাড়িতে। সেদিন সন্ধ্যেবেলা দরকারী কথা আছে এই বলে অদিতিকে বাড়ির পিছন দিকে ডেকে এনেছিল জমজমাট আসর থেকে। পিঙ্ক গ্রাউনের ঘেরের আড়ালে লোকানো ছিল চকচকে ধারালো ছুরি। ছুরিটা হাতে নিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে। চোখে আগুন ঝরছিল মেহুলের। অদিতি যখন মেহুলের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে তখন অনেকটা দেরী হয়ে গেছে; মেহুল ওকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ওর বুকের উপর উঠে বসেছে। গলায় ঠেকানো প্রাণঘাতী ছুরি। অদিতির সকল আর্তনাদ জোরালো মিউজিকে চাপা পড়ে গিয়েছিল। সেই সময় বাবি এদিকে চলে এসেছিল তা না হলে মেহুলকে এখন জেলে থাকতে হতো। 

এই জন্য মেহুলের এই নির্বাসন। বাবা তো, তাই প্রাণে ধরে নিজের মেয়েকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারেন নি রণজিৎ সেন। তবে শাস্তি হিসেবে কলেজ ছাড়িয়ে, শহর থেকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে।

পরদিন সকালে আবার ছুটে গিয়েছিল গাছটার কাছে। ওই ছেলেটা কেমন অদ্ভুত ভাবে আকর্ষণ করছে মেহুলকে।
গাছের নীচে  বসে ছিল ছেলেটি। মেহুল পৌঁছতেই বলেছিল,
'কী ব্যাপার এত দেরী হলো যে আসতে?'
-'কে তুমি?' মেহুল জিজ্ঞাসা করে
--' আমি বিভাস। এই হিজলতলিতে আমার বাস।'
-' আমাকে চিনলে কীভাবে?'
-- ' চেনা মানুষকে আবার কীভাবে চিনব?'
- ' মানে?'
- - 'ও কিছু না। তবে তুমি এখানে কেন এসেছ তা আমি জানি।'
- 'তুমিও জানো আমি একজন খুনি। তাই তো।'
- - 'না না তুমি খুনি নও। তুমি একজন কাঙালিনী। ভালোবাসার কাঙাল।'
- 'কি বলছ এসব!'
- -' তবে তুমি বড্ড বোকা। ভালোবাসা কী জোর করে পাওয়া যায়?'
মেহুল আর পারে নি, হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিল বিভাসের সামনে। ভেঙে পরেছিল কান্নায়। 
'আমাকে কেউ ভালোবাসে না।'
'কে বললো বাসে না। এই যে তোমার চারপাশে ফুলগুলো ছড়িয়ে আছে, জানো কি ফুল?'
দুদিকে মাথা নাড়লো মেহুল।
' এ হলো হিজল ফুল, ভিজে পথে শিতলপাটির মতো বিছিয়ে থাকে, কেউ তোলে না, মালা গাঁথে না, কেবল পথিক যখন পথ দিয়ে যায়, তখন ওদের ভালোবাসে। 
ভালোবাসা ঠিক এমনিও হয় মেহুল। তুমি না হয় হিজল ফুল হলে।'

অবাক হয়ে দেখল বিভাসের দিকে। রঙ উঠে যাওয়া একটা পাঞ্জাবি, গালে না কাটা দাড়ি, এলোমেলো চুল, গায়ের রঙ কালো। কালো মানুষদের ঘৃণা করত মেহুল, দূরে সরিয়ে রাখতে সাধারণ পোশাক পরা, সাধারণ চেহারার মানুষদের। আজ মেহুল মুগ্ধ হয়ে দেখছে বিভাসকে। 

মাস দুয়েক কেটেছে। রণজিৎ বাবু এসেছেন মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। পিসির মুখে শুনেছেন বদলে যাওয়া মেহুলের সমস্ত ঘটনা। 

মেহুল হিজল তলায় এসেছে আজ, পায়ের নূপুরের মিষ্টি রুমঝুম সারা ফেলে দিয়েছে হিজল ফুল গুলির মধ্যে। ওরা মেহুলের পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে ওকে খুশি করতে ব্যস্ত। কিন্তু আসল মানুষটা চুপচাপ। বড়ো অভিমান হয়েছে তার। তিনদিন মেহুল আসেনি এইখানে।

' এই যে মশাই রাগ হয়েছে বুঝি?' বিভাসের পাশটিতে বসে জিজ্ঞেস করে।
-' হবে না? তিনদিন পর আসা হলো। তাও দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো এখন কন্যে এলেন।'
--' আরে বাবি এসেছে তো। তাই বেরোতে পারিনি গো একদম। আর এখন এদিকে কেউ আসতেই দেয় না গো। কুসুম পিসিঠাম্মিকে বলেছে আমি না কি হাওয়ার সাথে কথা বলি। তারপর থেকে আমাকে একা কেউ কোথাও বেরোতে দেয় না।'
-' হুম... বুঝেছি। তোমাকে হয়তো হিজলতলি ছেড়ে চলে যেতে হবে।'
--'কি বলছ!'
-'হ্যা। তোমাকে কেউ আমার কাছে আর আসতে দেবে না মেহুল।'
--কেন বিভাস?
-কারণটা তুমি বুঝবে। আমি আর নাই বা বললাম। আমিও তোমায় বিদায় দিলাম আজ। আমার কথায় তুমি নূপুর পরেছ, আমার রে কতটা ভালো লেগেছে তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না মেহুল।
--আমায় চলে যেতে বলছ বিভাস?
-তোমার নিজের কাজে ফিরতে হবে মেহুল। তোমার বাবি তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন যে।
--বেশ চলে যাব। ভালোবাসা তো জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া যায় না। 
-এমন ভাবে বলো না। তোমার স্বপ্নে আমি থাকব ঠিক। যখন মনে পড়বে আমায়।
উঠে চলে আসবে মেহুল, হাত ধরে থামালো বিভাস, --'অভিমান করে চলে যেও না মেহুল।'
মেহুলের হাতে ধীরে ধীরে তুলে দিল নিজের হাতের আংটি। বিভাসের স্মৃতিচিহ্ন হাতের মুঠোয় নিয়ে ফিরে এলো মেহুল। 

চোখের জল বাঁধ মানছে না। বিভাস যে অস্তিত্ত্বহীন একথা মেনে নিতে পারে নি। ও ছাড়া আর কেউ কখনও বিভাসকে দেখতে পায়না একথা জানার পরেও।

শহরে ফিরে আসার পর মাসতিনেক কেটে গেছে। পূর্ণিমার রাতে আকাশে জ্যোৎস্নার প্লাবন মাটি ছুঁয়ে যায়। বাড়ির ছাদে চেয়ারে বসে আছেন রণজিৎ বাবু। মেহুল এখন শান্ত একটি মেয়ে, এই উৎশৃঙ্খল অবুঝ মেয়েটি হারিয়ে গেছে। কাছে থাকে অথচ যেন কত দূরের সে। রাতের আকাশ ভয় পায় না আর। স্বপ্নে আর মায়ের অ্যাক্সিডেন্ট দেখে ভয়ে কেঁদে উঠে রক্ত রক্ত বলে চিৎকার করে না। রনজিৎ বাবু লক্ষ্য করেছেন ঘুমের মধ্যে মৃদু মৃদু হাসে মেয়েটা এখন। নিস্তব্ধতা কাটতে তিনি মেহুলকে একটা গান শোনাতে বললেন।সেই ছোট্টবেলায় প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে গান ছেড়ে দিয়েছিল। আবার গান শিখছে নতুন করে। কলেজে যায় আগের মতো। 
মেহুল দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে গাইছে...

"নিবিড় অমা-তিমির হতে   বাহির হল জোয়ার-স্রোতে
                      শুক্লরাতে চাঁদের তরণী।"
হাতের আঙুলে জ্বলজ্বল করছে বিভাসের দেওয়া আংটি; তার অস্তিত্ব কেবল মেহুলের চোখে। সুরের আবেশে ছাদ জুরে ছড়িয়ে পড়ছে এই অকালের হিজল ফুলের সুবাস, তৃপ্ত করছে মেহুলকে, গহন জোছনায় ডুব দিয়ে মেহুল কুড়িয়ে তুলছে সঙ্গসুধা।

No comments