গল্পঃ ঋণ শোধ
রান্নাঘরে গ্যাসের সামনে এই গরমে সেদ্ধ হতে আর ভালো লাগে না মীনাক্ষী দেবীর। সকাল সকাল কোনোরকমে রান্নাটুকু সেরে ফেলতে পারলে ভালো । এরমধ্যে সকালের জলখাবার তৈরি করতে হবে। ফ্রিজ থেকে দুধ টা নিয়ে আসার জন্য রান্নাঘরের বাইরে পা রাখতেই, মনে হলো সামনের বারান্দা থেকে একটা বেশ লম্বা কারোর অবয়ব সরে গেল। আশ্চর্য অলোকেশ বাবুও এখন ছাদ বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত। কাজের মেয়ে রুমকি এখনও এসে পৌঁছয় নি। কে ঢুকলো বাড়িতে? বারান্দায় গিয়ে দেখলেন কেউ নেই। সদর দরজা বন্ধ। ঘর গুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু দেখতে পেলেন না। অথচ চেহারাটা খুব চেনা চেনা লাগলো, কোথায় দেখেছেন মনে পড়লো না। এসময় অলোকেশ বাবু ছাদ থেকে নেমে এলেন। যথারীতি ব্যাপারটা তেমন আমল দিলেন না।
পুজো কোন্ সকালে সারা। এখন দুজনে চা, জলখাবার খাবেন, এরমধ্যে রুমকি কাজ করে চলে গেলে, মীণাক্ষী দেবীও বাকী রান্না সেরে আবার স্নানে ঢুকবেন,তারপর তার গোপালকে দুপুরে খেতে দিয়ে তবেই তিনি দুপুরের খাওয়া দাওয়া করবেন। এই রুটিন চলে আসছে তাঁদের একমাত্র মেয়ে তিয়াসের বিয়ের পর থেকেই।
ছাদে কাপড় মেলতে এসে আবার মনে হলো পিছনে একটা ছায়া সরে গেল, এই নিয়ে দুবার। মনটা খচখচ করছে। এই খচখচানি নিয়েই গোপালকে খেতে দিতে গেলেন মীণাক্ষী দেবী। ঠাকুরের সামনে বসে মনটা শান্ত করতে চাইলেন। আজকে ওই ছেলেটার কথা বড়ো মনে পড়ছে, মউল। হঠাৎ পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে এলো। তিনি তো রান্না ঘরে কিছু বসিয়ে আসেন নি। তবে!!
ঠিক তাই, যা ভেবেছেন। আলোকেশ বাবু চায়ের জল চাপিয়ে ঘরে চলে গেছেন।রুমকি বোধহয় বাথরুমে কাপড় কাচছে। রান্নাঘরে গিয়ে তো থমকে গেলেন মীণাক্ষী দেবী!
আগুনের পাশেই গ্যাস মোছার কাপড়টা রেখে চলে গেছেন অলোকেশ। ওই কাপড়ে আগুন ধরেই পোড়া পোড়া গন্ধ ছাড়ছে। তাড়াতাড়ি কাপড়টা সরাতে গিয়ে বিপত্তি ঘটল। মীনাক্ষী দেবী একটা পুরোনো গরদের শাড়ি পরে পূজো দেন। তাড়াহুড়োয় ওই শাড়ি তে আগুন ধরে গেল। সিল্কের কাপড় দ্রুত আগুন ছড়াবে। ভয়ে দিশেহারা হয়ে দেখলেন ওই তার শাড়ীর আগুন লাগা অংশটা দ্রুত আলাদা হয়ে গেল। কেউ যেন প্রাণপনে ছিঁড়ে দিল। জ্ঞান হারানোর আগের স্পষ্ট দেখলেন তাঁকে দুহাতে আগলে ধরে আছে মউল। চিৎকার শুনে অলোকেশ আর রুমকি ছুটে এলো, আর কিছু মনে নেই।
চোখ মেলতেই দেখতে পেলেন তিয়াস, অলোকেশ আর রুমকি তার দিয়ে উদ্বিগ্ন ভাবে চেয়ে আছে। জামাই রণজয়কেও খবর দেওয়া হয়েছে। মীনাক্ষী দেবী তাড়াতাড়ি উঠে বসে তিয়াসের হাতদুটো ধরে বলে উঠলেন, 'মনা জানিস, মউল এসেছিল। মউল!'
তিয়াস অবাক হয়ে চেয়ে রইল মায়ের দিকে।
মীণাক্ষী দেবী আবার বললেন, 'হ্যাঁ, রে মউল বাঁচিয়েছে আমায়।'
তিয়াসের চোখে জল। 'মউল এসেছিল! কী বলছো মা!'
এই নামটা তিয়াসের বুকের মধ্যে একটা গভীর দাগ কেটে রেখেছে তা জানেন তিনি, শুধু কী তিয়াসের চোখেই জল আনে?
তার আর অলোকেশের চোখেও তো জল।
'তবে কী মা ও ঋণ শোধ করে গেল!'
তিয়াসের কথায় চমকে উঠলেন.. 'ঋণ শোধ!'
রাত হতে চলল। তিয়াস আর রণজয় চলে গেছে। রান্নাঘরের দায়িত্ব এখন অলোকেশের হাতে। এইকদিন আর রান্নাঘরে ঢুকতে পারবেন বলে মনে হয় না। ভয় তাড়া করছে এখনো।
বারান্দায় এসে বসলেন মীণাক্ষী দেবী। প্রায় সাত-আট বছর আগের দিনটা মনে পড়ছে, যেদিন মউল কে তিয়াস তার সামনে নিয়ে এসেছিল। মউল সেন, লম্বা রোগা ছেলেটা মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, চোখদুটো বেশ গভীর। তিয়াস পরিচয় করিয়েছিল কলেজের বন্ধু বলে। তবে তিনি আঁচ করেছিলেন সম্পর্কটা নিছক বন্ধুত্বের নয়। পরে তিয়াসকে চেপে ধরতে সত্যিটা বলেছিল। মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল মীণাক্ষী দেবীর। তিয়াস মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে সাধারণ কলেজে ভর্তি হওয়ায় ক্ষোভ তো ছিলই, তার উপর সে কোথাকার চালচুলোহীন একটা সাধারণ ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়েছে। যার বাবা-মা র মধ্যে সম্পর্ক নেই। কষ্টে-সৃষ্টে চলা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। তিনি তিয়াসের জন্য কোথায় তার বান্ধবী সুচরিতার ছেলে রণজয়কে ঠিক করে রেখেছেন। রণজয় ডাক্তারি পাশ করা ছেলে, প্রচুর পৈতৃক সম্পত্তি ওর।
অনেক অশান্তি হয়েছে মা মেয়ের মধ্যে। আলোকেশ অবশ্য মেয়ের পক্ষই ধরেছিলেন। শেষে মেয়ের জেদের কাছে খানিকটা হার মেনেই জানিয়ে দিলেন মউল ভালো সরকারি চাকরি না পেলে তিনি এ বিয়ে হতে দেবেন না।
তখন ওদের কলেজের লাস্ট ইয়ার চলছে। কলেজ পাশ করে,অবশ্য বছর দুয়েকের মধ্যে মউল ব্যাঙ্কের চাকরি টা পেয়ে যায়। বর্ধমানে পোস্টিং ছিল। একরাতে মউলদের কাজের মেয়েটা ফোন করে তিয়াসকে। তিয়াস তাড়াতাড়ি ওদের বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ মানুষটাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হার্ট অ্যাটাক, অল্পের জন্য বেঁচে যান সে যাত্রা। পরদিন সকালে, মীণাক্ষী আর অলোকেশ হসপিটালে গিয়েছিলেন মউলের মাকে দেখতে। তখন নিজের চোখে দেখা মউল তিয়াসের হাতদুটো ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ' তুই যা করলি আমার জন্য তা কোনোদিন ভুলব না। এ ঋণ আমি প্রাণ দিয়ে হলেও শোধ করব।'
আজ কী তবে ঋণ শোধ করে গেল ছেলেটা। বিপদের আঁচ পেয়ে ছায়ার মতো তার সাথে ছিল সেজন্যই?
মেনে তো নিয়েই ছিলেন মউলকে, ওদের বিয়ের দিন স্থির হবে দিনকয়েকের মধ্যে এমনই কথা ছিল। কিন্তু.. সেই দিনটার কথা মনে পড়লেই.. বাংলা তারিখটা মনে আছে, ৫ ই ফাল্গুন। সামনের বছর আর পাঁচদিন পর ওদের বিয়ের দিনটা ঠিক হোক এই ইচ্ছে ছিল অলোকেশের। মউলের মা মধুমিতা ফোন করে অ্যাক্সিডেন্টের খবর টা জানান। বাইক কিনতে বারবার নিষেধ করেছিলেন মীণাক্ষী দেবী। কেউ শুনল না তার কথা।
চোখ বুজলে এখনো দেখতে পান দেহটা...
মাথার চুলে তখনো রক্ত জমে, বিবর্ণ মুখটায় মায়া জড়ানো ছিল শেষ অবধি। কম করেও চারটে বছর কাটলো। সবাই ফিরে এসেছেন ভয়াভয় স্মৃতি থেকে। তিয়াসও ফিরেছে নতুন জীবনে। তবু ভোলেনি মউল। ভোলেনি তার ফেলে যাওয়া সবকিছু, তার ফেলে যাওয়া জীবনকে।
---------------------

বেশ ভালো। শর্তহীন ভালোবাসা।
ReplyDelete