#মন_ভ্রমণ-পর্ব ১ || ০৮.০৩.২০২১
#মন_ভ্রমণ-পর্ব ১ || ০৮.০৩.২০২১
সবসময় বুঝি দূরেই যেতে হবে? অজানা পথে?
আজ না হয় চললুম চির চেনা জীর্ণ ঘাট টায়।
ঘাটের সিঁড়িতে ফাটল ধরেছে অনেকদিনের। পাশেই একটা আটচালা ধাঁচে প্রাচীন শিবমন্দির। পূজারীর ভিড় নেই। তবু দেবতা অভুক্ত থাকেন না। সেই মন্দির জড়িয়ে বেড়ে উঠছে এক অশ্বত্থ গাছ। এর শিকড়ই ঘাটের সিঁড়িতে ফাটল ধরিয়েছে। ভোরবেলা আমরা এসে বসলাম মন্দিরের চাতালে জলের দিকে মুখ রেখে।
নদীর জল নিয়ম মতো বয়ে যাচ্ছে। জেলে নৌকো গুলো এখন মাঝ নদীতে দেখা যায়। মাঝে মাঝে বাতাস বইছে মাঝে মাঝে গুমোট ভাব। এদিকটায় গাছপালার সংখ্যা অনেক। পাখিদের কলকাকলিতে নির্জনতা খান খান। এই ঘাটে স্নানের ভীড় নেই। কেবল বুড়ো সন্ন্যাসী আসেন রোজ। প্রতিটা কাজের মতোই যত্ন নিয়ে স্নান করেন তিনি। সিক্ত বস্ত্রে উদাত্ত মন্ত্রে জলার্পণ ঘাটের পরিবেশ টা বদলে দেয়। এরপর পূজায় বসবেন তিনি। কমন্ডুলে শীতল বারি আর একমুঠো ফুল নিয়ে প্রবেশ করবেন জীর্ণ মন্দিরে। ধূপ- চন্দনের সুবাসে বিকশিত হবে দেব মাহাত্ম্য।
মন বিষন্ন আজ, লেখা জমা আছে অনেক। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। লিখতে হবে বিষয়টা নিয়েও। তবে লিখতে ইচ্ছে করছে না মোটেও। সবাই লিখবে কিছু না কিছু। কেমন যেন হঠাৎ জেগে উঠেই ঘুমিয়ে যাবে। বাধা কতগুলো বুলি।
বন্ধু বলে, এভাবে ভাবিস বলেই জীবন জটিল। কিছু কিছু দিন উৎযাপনেরও প্রয়োজন আছে। ধর, কেউ তার কথায় তুলে ধরলো সমাজের বঞ্চিতা, নিপীড়িতা নারীদের দুঃখ-যন্ত্রনা, আবার কেউ বীরাঙ্গনাদের কুর্নিশ জানালো। ক্ষতি কী? দেখ না আজ হয়তো, কেউ তার স্ত্রী কে সকালের জলখাবারটা রেডি করে ঘুম থেকে ডাকল, কোনো প্রেমিক প্রথম মেসেজ টায় দিনটার শুভেচ্ছা জানালো তার ভালোবাসাকে, কোনো ছেলে তার মাকে আজকে একটা ছোট্ট উপহার দিল। শুনতে কেমন লাগছে বল? ভালো তো? হ্যা এটাই হচ্ছে মুহুর্ত, এই খুশি গুলোই আসল। দেখ তুই যখন ভাবছিস তখন তোর মাথার উপর একটা শীতল স্পর্শ খেলে যাচ্ছে, এটাই শান্তি, এটাই আনন্দ। কী হবে এরমধ্যে যুক্তি, তর্ক, দ্বন্দ এনে?
জানি, তুই বলবি এতে কি সমাজের যত সমস্যা সব সমাধান হয়ে যাবে? কখনোই না। এতবছরের সমস্যা একদিনে কি সমাধান হয়?
তবে নতুন করেও তো ভাবতে হবে। এই যে নারী-পুরুষের এত বিরোধ, তবু একে অন্যের ছায়াসঙ্গী। নারীর কিছু দুঃখ যেমন পুরুষ কে স্পর্শ করতে পারে না তেমনই পুরুষেরা মাথা ঠুকে মরলেও তাদের কিছু আনন্দের নাগাল পাবে না।
আর যত ভেদ তো বাইরে। আমাদের আত্মা পুরুষও নয় নারীও নয়, সে এক আর অভিন্ন।
আমাদের ভিতরে নারী আর পুরুষ পাশাপাশি দুই সত্ত্বাই বিরাজমান। কেবল এক সত্ত্বা প্রকট হয়, সেটাই আমাদের শরীরে মনে প্রকাশ লাভ করে। কখনো আরার প্রকাশ আর অন্তরসত্ত্বার মধ্যে দ্বন্দ দেখা দেয়। তখনই মানসিক আর শারিরীক প্রকাশে ভিন্নতা দেখা দেয়। এ তো শরীর বিজ্ঞান বলে। X আর Y এর খেলা।
আমি ভাবছি এই কথাটাই,মানুষ মাত্রই এক দেহে দ্বি-সত্ত্বা, এক সত্ত্বা সুপ্ত আর এক জাগ্রত। এই তো আসল কথা। অভিন্নতার মধ্যে ভিন্ন রূপ। তাও দ্বন্দ, বিরোধ, একে অন্যকে দাবিয়ে রাখতে চাওয়া, দুর্বলতার সুযোগে অত্যাচার এই তো চলছে। অথচ কথা ছিল পাশাপাশি হাঁটার, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার একে অন্যের পরিপূরক হয়ে।
মনে মেঘের জট। এই সময়েই বন্ধু ধরলো লালন গান...
আমার ঘরের চাবি পরেরই হাতে।
কেমনে খুলিয়া সে ধন দেখবো চক্ষেতে।।
আপন ঘরে বোঝাই সোনা
পরে করে লেনা দেনা
আমি হলাম জন্ম-কানা
না পাই দেখিতে।।
রাজি হলে দারওয়ানি
দ্বার ছাড়িয়ে দেবেন তিনি
তারে বা কৈ চিনি শুনি
বেড়াই কুপথে।।
এই মানুষে আছে রে মন
যারে বলে মানুষ-রতন
লালন বলে, পেয়ে সে ধন
পারলাম না চিনতে।।
সত্যিই তো সবই তো আমাদের মধ্যেই, নিজের ভিতরই বাস করে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর অথচ পরকে দোষী করি।
দেবালয়ে ঘন্টার ধ্বনি আর পূজার পবিত্রতা সিক্ত করছে মন-প্রাণ। মনের মেঘ কাটল। বুড়ো সন্ন্যাসীর দেওয়া প্রসাদে পুজোর পূণ্য টুকু সঞ্চয় করে ফেরার পথ ধরলাম।
- উপাসিকা চ্যাটার্জ্জী

আহা...
ReplyDeleteএ মানুষে আছে রে মন, যারে বলে মানুষ-রতন, লালন বলে, পেয়ে সে ধন, পারলাম না গো চিনতে...
বেশ,নিজের ভিতরেই খুঁজি সমস্ত প্রশ্নের উত্তর।অসাধারন।��
😊😊
Delete