হারানো রূপকথা
সন্ধ্যার মুখ চিনিয়ে চোখের সমান্তরালে উড়ে গেল একটা কাক। ঘরের ছোট্ট বারান্দাটায় একা বসে আছে মধুমিতা। আলো জ্বালবার ইচ্ছাটুকু আজ আর হচ্ছে না। বোধহয় সকল আলো নিভবার সময় হয়ে গেল।ছোট্ট তুয়া ছুটে এসে বেতের কুরসিটার হাতল ধরে দাঁড়াল। আবছা অন্ধকারে অবাক হয়ে দেখছে তার ঠামমাম কে, কেমন চুপ করে বসে আছে ঠামমাম। ও যে ঠামমাম কে একটা নতুন জিনিস শোনাতে এলো। কই ঠামমাম তো তাকে কোলে তুলে নিল না। আলতো করে নরম হাতটা রাখল ঠামমামের হাতে, জিজ্ঞাসা করল " তোমার মনখারাপ?"
উত্তর এলো "হুম।"
- " কেন? তোমায় কি কেউ বকেছে ঠামমাম?"
- " আমার একটা খুব প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেছে সোনা।"
- " প্রিয় জিনিস? কী ঠামমাম?
- " রূপকথা।" গলাটা একটু কেঁপে উঠল এবার।
ছোট্ট তুয়া আরো অবাক হলো। তার ঠামমামের চোখে তখন মেঘের মতো জল জমছে।
- " তুমি ওঘরে গিয়ে খেলা করো সোনা। আর পিয়ালী মাসির কাছে গিয়ে দুধ টা খেয়ে নাও। মা, বাবা না ফেরা অবধি একটুও দুষ্টুমি করবে না কেমন।"
অন্যদিন হলে অনেক বায়না করত তুয়া। মধুমিতা কে গল্প বলে তারপর খাওয়াতে হতো। কিন্তু আজ তুয়া বড়ো বাধ্য মেয়ে। দুধ খেয়ে একমনে নিজের খেলনা নিয়ে খেলতে লাগল।
তুয়া চলে যেতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামল সেই জমা মেঘ থেকে। সেই বৃষ্টি গাল বেয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে বুক, ভিজিয়ে দিচ্ছে মন, ভিজিয়ে দিচ্ছে আর ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর আর সদ্য যৌবন। হ্যাঁ হারিয়েই তো গেল সে। কিছুক্ষণ আগেই এই সামনের রাস্তাটা দিয়ে ফুলে ফুলে সাজানো রথে করে এই যে মানুষটা চলে গেল, সেই যাওয়াটা কি হারিয়ে যাওয়া নয়?
এই তো সেদিন, এই তো মাস ছয়েক আগে মানুষটাকে হঠাৎ খুঁজে পেয়েছিল, খুঁজে পেয়েছিল তার সেই হারিয়ে যাওয়া বিলু দা কে। তাদের পাড়ায় নতুন আসা তার ছেলের সহকর্মী তন্ময়দের নিমন্ত্রন করতে বলেছিল মধুমিতা। ছেলে সৃজন তার কথামতোই সেদিন সপরিবারে নিমন্ত্রণ করেছিল তন্ময় দের। ওরা আসার পর অভ্যর্থনা জানাতে যখন বসার ঘরে এসেছিল, তন্ময় আর ওর স্ত্রী শ্রীতমা সোফা থেকে উঠে ওকে প্রণাম করে, চিবুক ছুঁয়ে ওদের আশীর্বাদ করার পরই চোখ পড়ে সোফায় বসা সৌম্যদর্শন ভদ্রলোকের দিকে। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন দীর্ঘ দেহের মানুষটি, সৌজন্য জানাতে যখন দুহাত জড়ো করলেন নমষ্কারের ভঙ্গিতে। থমকে গিয়েছিল মধুমিতার পৃথিবী। ভুলে গিয়েছিল প্রতি নমষ্কার জানাতে। অস্ফুটে বলেছিল " বিলু দা তুমি?"
চমকে উঠেছিলেন কৃষ্ণেন্দু মুখার্জ্জী। ভালো করে চেয়ে ছিলেন বর্ষীয়ান মহিলাটির দিকে, সামান্য কিছু সময় লেগেছিল তাঁর চোখে উচ্ছাস ফিরে আসতে। সেই উচ্ছাস দমিয়ে রাখতে না পেরে তিনিও বলে উঠেছিলেন " বিন্দু তুই?"
অবাক হয়ে গিয়েছিল মধুমিতার পুত্র সৃজন, পুত্রবধূ সোহিনী। অবাক হয়েছিল তন্ময়রাও।
'বিন্দু' নাম টা যেন কত শতাব্দী আগের কোনো এক সমুদ্রের তীর ছুঁয়ে আসছে। কতকাল শোনেনি তার বিলু দার মুখের এই প্রিয় ডাক টা।
অতীত থেকে ফিরে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণেন্দু বাবু অবশ্য বলেছিলেন, যে তারা ছেলেবেলায় পরস্পরকে চিনতেন, পাশাপাশি বাড়ি ছিল তাঁদের।
শুধুই পড়শি? মনে মনে প্রশ্ন করলেন মধুমিতা। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস সবার অগোচরে থাকলেও চোখ এড়ায়নি কৃষ্ণেন্দু বাবুর।
পরে পাড়ার পার্কে প্রাতভ্রমনের সময় দুজনে যখন একান্ত আলাপের সুযোগ পেয়েছিল, তখন মধুমিতা ওরফে বিন্দুর প্রশ্নের স্রোত ধেয়ে এসেছিল তার বিলুদার দিকে- " কোথায় হারিয়ে গেছিলে তুমি বিলুদা? জানো জ্যাঠামশাই তোমাকে পাগলের মতোন খুঁজেছিলেন, জেঠিমা খাওয়া- দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন।"
প্রতিটা বাক্যে কেবল ঝরে পড়ছিল রুদ্ধ অভিমান। সেই কিশোরি বেলায় ফিরে যাওয়া পক্ককেশী প্রৌঢ়ার দিকে তাকিয়ে সেই বিলু দাদা কেবল জিজ্ঞাসা করেছিলেন-
" আর তুই? ভাবিস নি আমার জন্যে?"
উত্তর দিতে গিয়ে সকল অভিমান মেঘ জমেছিল চোখের কোণে। " আমার ভাবনায় তোমার আর কিইবা আসে যায় বিলু দা।"
দুজনের মাঝে প্রায় বছর পঁয়তাল্লিশের নীরবতা।
এতগুলো বছরের দীর্ঘপথের স্মৃতি হাতরাতে হাতরাতে পৌঁছে গেল সেই সময়, যখন সে বছর ষোলোর দূরন্ত কিশোরী আর তার বিলুদা সদ্য যুবক। পাশাপাশি বাড়ি, জেঠিমা মানে বিলুদার মায়ের নয়নের মণি ছিল সে। ছোট্টবেলা থেকে তার বিলুদাদার সমস্ত আবদার মেটানোর একমাত্র জন হলো বিন্দু। সে তার ঘুড়ির আঁঠার জন্য ভাত চুরি করে আনা থেকে জেঠিমার মারের হাত থেকে বাঁচানো, সব।
সেদিন দুপুরে প্রায় দিনের মতো কুলের আচার হাতে করে বিন্দু হানা দিয়েছিল বিলুদার চিলেকোঠার সাম্রাজ্যে। বিন্দু জানে বিলু একেবারেই টক খাওয়া পছন্দ করে না। সেই দুপুরে চিলেকোঠার আলো আঁধারিতে হঠাৎ এক দুর্বল মূহুর্তে বিলুর উষ্ণ আলিঙ্গন শিহরণ তুলেছিল বিন্দুর প্রস্ফুতিত নারীদেহে। চমক ভাঙতেই বিলুদার বাহু ডোর থেকে নিজেকে ছিন্ন করে সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নামতে নামতে কানে এসেছিল মা আর জেঠিমার কথার টুকরো। বুকের স্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছিল বিন্দুর। তাঁরা যে তাদের বিলু আর বিন্দুর বিবাহের কথা ভাবছিলেন, কটা বছরের অপেক্ষা শুধু। বিলু একটা চাকরি পেলেই....
উপরে তখন স্থবীর হয়ে কি ভাবছিল বিলু? কিসের গ্লানি পুড়িয়ে দিচ্ছিল তার অন্তর? তার চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল সে কোন যোগী পুরুষ?
ঘরে ফিরে বিন্দু সকলকে লুকিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। বিলুদার পাশে নিজেকে কল্পনা করতেই লজ্জায় মিশে যাচ্ছিল সে।
পরদিন ভোরে জানা গেল, মুখার্জ্জী বাড়ির মেজো ছেলে বিলু নিখোঁজ। তার চিলেকোঠার ঘরে পাওয়া গেল একটা চিঠি।
তাতে কেবল লেখা, "একটা মহৎ উদ্দেশ্যে সংসার ছাড়লায় আমি। আপন পথ খুঁজতে বেরোলাম।"
তারপর.... বছর ঘুরল। বিন্দুর অপেক্ষা ফুরোয় না আর। কালের নিয়মে বয়স বাড়তে বিয়ে হয়। স্বামী নির্মাল্য আর পুত্র সৃজন কে নিয়ে ব্যস্ত সংসার। স্বামী ছেড়ে গেছেন বছর পাঁচেক আগে। তারপর এতবছর বাদে দেখা তার ভালোবাসার সাথে।
হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার কৈফিয়ত যে দিতে হবে, তা কোনোদিন ভাবেন নি কৃষ্ণেন্দু বাবু। আজ বিন্দুর সামনে জবাবদিহি করতে তো হবেই। যার স্বপ্নকে তিনি নিজের হাতে শেষ করেছেন তার কাছে জবাব দিতে তো তিনি বাধ্য।
তিনি শুরু করলেন অজানা সেই কাহিনী-
"বাড়ি ছাড়ার আগের দুপুরে তোর প্রতি আমার দুর্বলতা যখন প্রকাশ পেল, তখন আমি নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে গেলাম। তোকে যে এমন চোখে আমি দেখব, তা কোনোদিন ভাবানি। আমার মন, আত্মা তখন পড়ে এক দুঃখিনী, ক্ষুধার্ত ভারতবর্ষের কাছে। আমার চোখে তখন ভাসে স্বামী বিবেকানন্দের উজ্জ্বল মুর্তি। তার বাণী আমার অন্তরে বাজে। আমার যে অনেক কাজ, আমার যে কাজ মানুষের সেবায়। এই মায়ায় জড়ালে, কে করবে এই কাজ?
তারপর সারাক্ষণ আমি কেবল ভাবলাম, কর্মসাধনার জন্য আমার যে মুক্তি প্রয়োজন। কোথায় গেলে আমি পাব সেই মোহ মুক্তির পথ?
সেই রাতেই বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে। তারপর কত মঠ, কত আশ্রম ঘুরে দেখা পেলাম আমার পরম গুরুর। তিনি আমায় দীক্ষা দিলেন না। বললেন "ভারতবর্ষকে যে জানবি, ভারতবর্ষকে চোখ চেয়ে দেখ আগে। খুঁজে দেখ এতবড়ো ভারতবর্ষে ঠিক কোন পথে কোন কাজ তোর জন্যে অপেক্ষা করছে।"
তাঁর সাথে চলে গেলাম সুদূর কাশ্মীর। সেখানে থেকে হিমাচলের গ্রামে গ্রামে ঘুরলাম। তারপর পশ্চিম থেকে দক্ষিণ, মধ্যভারত হয়ে প্রায় তিন-চার বছর পর আবার ফিরলাম এই বাংলায়। কত বিচিত্র মানুষের কত বিচিত্র জীবনযাত্রা। কাছ থেকে দেখেছি দেশের দারিদ্রকে। তবে দারিদ্রতার চেয়েও বেশী ভয় পেয়েছি অশিক্ষার অন্ধকার আর দুর্বল অসহায়ের উপর অন্যায় আঘাত। ঘুরতে ঘুরতে এলাম নদীয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। এখানেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল।
এক গরমের দুপুরে শ্রান্ত হয়ে আমি আর গুরুদেব বসে আছি এক বড়ো দীঘির পাড়ে । জলের মধ্যে আলোড়নের শব্দ তাকিয়ে দেখি একটি মেয়ে জলে ডুবে যাচ্ছে। কাল বিলম্ব না করে দুজনেই ঝাঁপ দিলাম জলে। পৌঁছে দেখি কলসিতে দড়ি বেঁধে আত্মহত্যা করতে চলছিল সে। অনেক কষ্টে তাকে ডাঙায় আনলাম। মেয়েটি একটু সুস্থ হতেই গুরুদেব তাকে আত্মহত্যার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মেয়েটি জানাল ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রতারিত হওয়ার এক করুণ কাহিনী। অনুঢ়া মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা। এই সমাজের কলঙ্কের হাত থেকে বাঁচতে মরণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার। মেয়েটির কান্নায় বুকের ভিতর কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠল। কতই বা বয়স তার। তোর মতো হয়তো একটু কম। ওর নাকের নাকফুল টা দুপুরের রৌদ্রে যখন ঝিলিক দিচ্ছিল তখন বারবার আমার তোর কথা মনে পড়ছিল । পাশে চেয়ে দেখলাম আমার গুরুদেবের চোখেও জল।"
-" তারপর?"আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা করল মধুমিতা।
-"তারপর আমার গুরুদেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন "নে ব্যাটা তোর পথে তুই এসে পড়েছিস।" আমি অর্থ বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকালাম গুরুদেবের মুখের দিকে। তিনি ওই মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন " ওই চেয়ে দেখ তোর ভারতবর্ষ, ওই হতভাগিনী মা ই তোর ভারতবর্ষ।" আমি বললাম, কিন্তু.... গুরুদেব আমাকে থামিয়ে বললেন "ঘরের মেয়েদের পাঁকে পাঁকে জড়িয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে তুই কোন মুক্তির পিছনে ছুটছিস রে বোকা?"
মেয়েটির নাম মিনু। আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, দুই হাঁটুর মাঝে মুখ লুকিয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে সে। লজ্জায় অপমানে নিজেকে মাটিতে মিশিয়ে ফেলছে। কোন অপরাধের শাস্তি ? পাপ-পূণ্যের বিচার এই নির্জন দীঘির পাড়ে করবে কে? এই বিরাট জগৎ পরিচালক এত প্রদেশ ঘুরিয়ে কেনই বা আনলেন এই অভাগিনীর কাছে?
সন্মত হলাম সেই অনাগত সন্তানের পিতৃ পরিচয় দিতে। সেই রাত্রে মিনুর বাবা- মায়ের সন্মতি নিয়ে গুরুদেব আমাকে সংসার বন্ধনে বেঁধে দিয়ে গেলেন।
আমি শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বন্ধনই আমার শেষ পরিণতি তবে? তিনি হেসে শুধু বলেছিলেন " সবকিছু উপরওয়ালার হাতে ছেড়ে দিয়ে তোর কর্তব্য করে যা।"
সেই বৈশাখী রাত্রে গুরুদেব আমাকে ছেড়ে একাই চলে গেলেন তাঁর গম্য পথ ধরে।
কয়েক মাস, শ্বশুরের ভরসায় দিন কাটল। মিনুর শরীরে ফুটে উঠতে লাগল মাতৃত্বের লক্ষণ। আমি পথিক হয়ে পথ হেঁটেছিলাম এতগুলো বছর। এই বদ্ধজীবন আমাকে অস্থির করে তুললো। মিনুকে তার বাবার জিন্মায় রেখে বেরিয়ে পড়লাম জীবিকার সন্ধানে। তখন আমার হাত শূন্য। বাড়ী ছাড়ার সময় কোনো সার্টিফিকেট সঙ্গে আনিনি। রোজগারের আশায় ছুটেছি এক শহর থেকে অন্য শহরে। রাজমিস্ত্রির জোগারে থেকে কারখানার শ্রমিক। কি না করেছি।"
- " তাহলে বাড়ি ফিরলে না কেন? জ্যাঠামশাই তোমাকে ফিরিয়ে দিতেন না।"
- " ফিরিনি কারণ ফিরতে পারিনি। ফিরলে কি জবাব দিতাম বাবা -মা, ভাই-বোন, আত্মীয়- পরিজন কে? পারতাম কি তোর সামনে মুখ তুলে তাকাতে?
অনেক ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে থিতু হলাম পাটনায়। একটা কারখানার হিসাব রক্ষার কাজ। ছোটোখাটো একটা বাড়ী ভাড়া করে চিঠি লিখলাম আমার শ্বশুর মশাইকে। তিনি আমায় ছেলের জন্ম সংবাদ দিলেন। জানালেন মিনুর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ, আমি যত শীঘ্র পারি সেখানে পৌঁছই।
আমি সংবাদ পাওয়া মাত্রই রওনা দিলাম, কিন্তু আমার পৌঁছানোর আগেই মিনু চলে গেল। শেষ দেখাটুকুও দেখতে পাই নি। ওখানে গিয়ে সদ্যজাত মাতৃহারা সেই শিশুকে দেখলাম। ও আমার নিজের সন্তান নয়, তবুও ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি অনুভব করলাম পিতৃত্বের স্বাদ। নাম দিলাম তন্ময়। মিনু আমাকে ওর জীবনের বিনিময়ে কত বড়ো উপহার দিয়ে গেল। সদ্যজাত শিশুকে কি ভাবে মানুষ করব আমি জানি না। তাই ওকে ওর দাদু দিদার তত্ত্বাবধানে রেখে ফিরলাম কাজের যায়গায়। নিয়মিত খবর নিতাম ওর। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ পাঠাতাম সেখানে।
তন্ময়ের ছয় বছর বয়স হতে আমি ওকে পাটনায় নিয়ে এলাম। ভর্তি করে দিলাম নামকরা বোর্ডিং স্কুলে। আমি সারাদিন খাটতাম ছেলেটাকে ভালোভাবে মানুষ করব বলে। আর ছুটে যেতাম মানুষের বিপদে আপদে। এমন ভাবেই ঈশ্বর আমাকে অর্ধেক সংসারে বেঁধে রাখলেন।
তারপর ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, ওর বিয়ে দিয়ে আমার কর্তব্য শেষ করলাম। ঝারা হাত পা হয়ে ঘুরতে লাগলাম দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে। ছত্তিশগড়ের বস্তারে যখন পৌঁছলাম, তখন শরীর ভেঙে পড়ল। ওখানে আমার কত কাজ বাকী ছিল রে বিন্দু। শেষে আর পারলাম না, পাটনায় ফিরলাম ছেলের কাছে। ছেলে ডাক্তার দেখাল, ধরা পড়ল কর্কটরোগ।"
কেঁপে উঠলেন মধুমিতা। " কি বলছ বিলুদা?"
- " হ্যাঁ রে। গোটা জীবন জুড়ে কত মানুষকে কত যন্ত্রনা দিয়েছি, এখন সবার দহন আমাকে ভিতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ি ছাড়ার সময় মা, বাবা, পরিবার কারোর কথা ভাবিনি। ভাবিনি তোর কথাও বিন্দু। তোর লজ্জা রাঙা মুখটা আমাকে আজও পোড়ায়। অবিচার করেছি মিনুর উপরেও। ওকে বিয়ে করেছি কর্তব্যের টানে, স্ত্রীর মর্যাদা দিই নি। মিনুকে কেবল তন্ময়ের মা হিসেবেই দেখেছি। আমি যেদিন চলে আসছি, মিনু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর চোখের দৃষ্টি আমি মেলাতে পারিনি। সে চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, এমনকি অভিমানও ছিল না। ও নিজের সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে আমার কাছ থেকে পাওয়া সমস্ত অবহেলা নীরবে গ্রহণ করেছিল। সেই দৃষ্টি আমাকে পোড়ায়। অবিচার করেছি ছেলেটার উপরেও, ছেলেটা আমার একাই মানুষ বলতে পারিস,বাবাকে কতটুকুই বা পেয়েছে, অথচ সেই বাবা ই শেষ বয়সে এসে ওর সুন্দর সংসারে রোগের কালো ছায়া এনে ফেলেছে। ওর আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা টাও আমাকে পোড়ায় জানিস বিন্দু। শেষ জীবনে ছেলের সাথে আবার কলকাতায় ফেরা।"
স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন মধুমিতা। ভোরের আলো সকাল পেড়িয়ে গড়াচ্ছিল বেলার দিকে।
তারপর, যতদিন বিলুদা ছিল ততদিন খেয়াল রেখেছে তাঁর শরীরের। মাঝে মাঝে তারা গল্পে গল্পে ফিরে যেতেন কিশোর বেলায়।
প্রত্যেকটি মানুষের জীবনেই রূপকথা থাকে। যা একান্ত গোপন। তার বিলুদাই তো ছিল তার রূপকথা।
আজ সে আবার হারিয়ে গেল। হারালো ছ'টা মাসের রূপকথা। তন্ময়দের গাড়ীটা শ্মশান থেকে ফিরল। কিছুক্ষণ পর দরজায় বেল বাজল। সৃজনরাও ফিরল বোধ হয়। চোখের জলটা মুঝে ফেললেন মধুমিতা। রাত বাড়ছে। উঠে আলোটা জ্বালালেন। রূপকথা কি আর সবার জীবনে সত্যি হয়?
--উপাসিকা চ্যাটার্জ্জী

Post a Comment